শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
কলকাতা-ভিত্তিক আইনজীবী মানব সোনি ২৬ বছর বয়সে কর্পোরেট আইনের কেরিয়ার ছেড়ে 'ফানস্মাট নলেজ সলিউশন ফাউন্ডেশন' নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এই ফাউন্ডেশনটি সারা দেশে শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নানা সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করে চলেছে। তিনি রিয়েল এস্টেট ল বা রিয়েল এস্টেট আইনে একজন আইনজীবী হিসেবে একটি স্থিতিশীল কেরিয়ার ও ভালো আয় ছেড়ে এই সামাজিক কাজে যোগ দেন। বর্তমানে তাঁর ফাউন্ডেশনটি ৩৫টিরও বেশি শহরে ৩.৮ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পরিবেশ রক্ষার্থে তাঁর টিম ৪,০০০-এরও বেশি গাছ লাগিয়েছে এবং প্রায় ১২ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেছে।
তাঁর এই কর্মকান্ডে প্রায় ৪০০-এরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করছেন। মাত্র দু'বছর আগেও মানব সোনির জীবনটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন । আইন স্কুল থেকে পাশ করেই সে কলকাতার রিয়েল এস্টেট খাতে একজন কর্পোরেট আইনজীবী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছিলেন। এমন এক স্থিতিশীল ও সম্মানজনক পথ, যার পেছনে বহু তরুণ পেশাজীবী বছরের পর বছর ছুটে বেড়ায়। সেই লাইন ছেড়ে বর্তমানে তিনি ফানস্মার্ট নলেজ সলিউশন ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা শিক্ষা, পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মহিলাদের স্বাস্থ্য এবং প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করা একটি তৃণমূল সংগঠন।
মানব সোনির এনজিও- এর সদস্যরা
সোনি বলেন," আমার কাছে, বিষয়টি হলো বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত উপায়ে সমস্যার সমাধান করা। আমরা যদি এক সঙ্গে প্রভাব ও মর্যাদা সৃষ্টি করতে পারি, তবে আজকের তরুণ-তরুণীরা কেন এই পথ বেছে নেবে না?" ২০২৪ সালে সোনির উদ্যোগ যা শুরু হয়েছিল, তা এখন ৪০০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ৩৫টি শহর জুড়ে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এই কর্পোরেট আইন থেকে সমাজসেবামূলক কাজে আসার পথটা মোটেও সহজ ছিল না সোনির কাছে।
কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা মানব সোনি বলেছেন, তিনি বরাবরই সমাজসেবামূলক কাজের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। স্কুলজীবনে তিনি পরিবেশ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রায়শই বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন। তবুও, পেশা বেছে নেওয়ার সময় বাস্তবতাই প্রাধান্য পায়।
বিবিএ ও এলএলবি শেষ করার পর সোনি কলকাতার রিয়েল এস্টেট সেক্টরে কর্পোরেট আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। কাজটি ছিল স্থিতিশীল, ভালো বেতনের কাজ এবং নিরাপদ। একজন তরুণ স্নাতকের যা কিছু চাওয়ার কথা, তার সবই ছিল এখানে। তবুও, কর্পোরেট জগতে দীর্ঘ সময় কাজ করার পরেও সপ্তাহান্তের দিনগুলো তাকে অন্য কোথাও টেনে নিয়ে যেত। তিনি তাঁর অবসর সময়ে সরকারী স্কুলের বাচ্চাদের পড়াতেন, বন্ধুদের সাথে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচীতে অংশ নিতেন এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করতেন।
তবে একটি অভিজ্ঞতা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। যে মেয়েটির পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা তিনি করেছিলেন, সে অবশেষে একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। মেয়েটির পরিবার যখন তাঁকে খবরটা জানাতে ফোন করল, তাদের স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিল।
“সেই মুহূর্তটা আমার মনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল,” তিনি স্মরণ করেন। “আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম, যদি একজনকে সাহায্য করাই এত বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে আমি কেন নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছি?” এর কিছুদিন পরেই ২০২৪ সালে তিনি কর্পোরেট চাকরি থেকে পদত্যাগ করে ফানস্মার্ট নলেজ সলিউশন ফাউন্ডেশন নিবন্ধন করেন। আজ দু বছর হলো তার এই ফাউন্ডেশন দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে সারা ভারতের বিভিন্ন শহরে।
মানব সোনির এনজিও- এর সদস্যরা
মানব সোনি বলেছেন, তিনি চেয়েছিলেন ফাউন্ডেশনটি যেন তরুণ, সৃজনশীল এবং সমাধানমুখী হয়। সেটা হতে দেখে তিনি খুবই খুশি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ফানস্মার্ট ধারণাটি এসেছে এই ভাবনা থেকে যে, মানুষ বাস্তব জগতের সমস্যার বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান তৈরি করার পাশাপাশি মজাদার ও উদ্ভাবনী উপায়েও চিন্তা করতে পারে। আর ‘নলেজ সলিউশন’ হলো সমাজের প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধানের জন্য ধারণা ও সচেতনতাকে কাজে লাগানো।”
বর্তমানে তার সংস্থাটি বৃক্ষরোপণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, স্যানিটারি হাইজিন সচেতনতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা এবং মহিলা ক্ষমতায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে। সংস্থাটি ৫০টিরও বেশি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং ৩.৮ লক্ষেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এই মানব সোনির পথ ধরেই কাজ করে চলেছেন বহু তরুণ। ধানবাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা অঞ্জনি প্রায়শই চিন্তিত থাকতেন যে আর্থিক সমস্যার কারণে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হতে পারে।
এই সংস্থাটি পরবর্তীতে তার কলেজের খরচের একটি অংশ বহন করে এবং তাকে যোগাযোগ, কর্মজীবনের প্রস্তুতি ও আর্থিক সাক্ষরতার ওপর দক্ষতা-বর্ধক কর্মশালার সাথে যুক্ত করে দেয়। “এর আগে আমার বেশিরভাগ শক্তিই টাকা-পয়সার চিন্তায় চলে যেত,” সে বলে। “এখন আমি নিজেকে উন্নত করা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার দিকে মনোযোগ দিতে পারি।”
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত দেবায়নের কাছেও এই অভিজ্ঞতাটি অসাম্য এবং তৃণমূল স্তরের কাজ সম্পর্কে তার ধারণাকে নতুন রূপ দিয়েছে। মানব সোনির বৃক্ষরোপণ ক্ষেত্রটি কলকাতা থেকে প্রায় ৭৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এছাড়া প্রকল্পটি প্রায় ৩০ জন সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তির জন্য জীবিকার সুযোগ তৈরি করেছে, যারা এখন বাগানটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন, চারাগাছে জল দেন এবং গাছ থেকে উৎপন্ন ফল বিক্রি করেন।
৫০ বছর বয়সী দীনেশ মোহান্তির জন্য এই সুযোগটি জীবন পরিবর্তনকারী হয়ে উঠেছে। প্রকল্পে যোগদানের আগে, দীনেশ খুব সীমিত আয়ে একটি স্কুলের মালী হিসেবে কাজ করতেন এবং একই সাথে তাঁর তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতেন। “বেতন খুব কম ছিল এবং সংসারের খরচ সামলানো কঠিন ছিল,” তিনি বলেন। মানব সোনি আশা করেন, অনেক তরুণ-তরুণীকে আগামী দিনে এই সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করবে।