হিনা সাইফি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক তরুণ কণ্ঠস্বর

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
হিনা সাইফি
হিনা সাইফি
 
মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি

ভারতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করা নারীর সংখ্যা হাতে গোনা। সেই উদীয়মান পরিবর্তনসাধকদের অন্যতম উত্তরপ্রদেশের মীরাট জেলার হিনা সাইফি। একটি ছোট ও সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে এসে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি আজ সারা দেশে পরিচিতি অর্জন করেছেন। মীরাটের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিএ সম্পন্ন করা ২৫ বছর বয়সী হিনা জানান, শুরুতে তাঁর এই উদ্যোগ প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আরও মানুষ তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন এবং আন্দোলন ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। আজ তাঁর সংগঠন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে।

মীরাট জেলার সিসোলা গ্রামের বাসিন্দা হিনা সাইফিকে রাষ্ট্রসংঘের (UN India) #WeTheChangeNow অভিযানের জন্য নির্বাচিত ভারতের ১৭ জন তরুণ জলবায়ু নেতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। এই প্রচারের লক্ষ্য হলো, ভারতের তরুণ পরিবেশকর্মীদের তৈরি তৃণমূল পর্যায়ের পরিবেশবান্ধব সমাধানগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। ২০১৮ সাল থেকে হিনা 100% Uttar Pradesh Campaign এবং The Climate Agenda-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
 
হিনা সাইফি
 
হিনার দৃঢ় বিশ্বাস, সমাজ যদি পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তবে প্রকৃতিকে অনেকাংশে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা সম্ভব। তবে তা তখনই সম্ভব, যখন সাধারণ মানুষ জলবায়ুবান্ধব অভ্যাস ও বাস্তবসম্মত জীবনযাত্রা গ্রহণ করবেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি জনসম্পৃক্ততা ও পরিবেশ সচেতনতাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
 
নিজ গ্রামের ক্রমাবনতিশীল পরিবেশ পরিস্থিতিই তাঁকে এই কাজের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, গ্রামে বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি তৃণমূলভিত্তিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই তিনি ও তাঁর দল ‘পরিষ্কার বাতাসের জন্য পদযাত্রা’ আয়োজন করেন, গ্রামে গ্রামে লিফলেট বিতরণ করেন, জনসভা করেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবেশ সংক্রান্ত সমীক্ষাও পরিচালনা করেন।
 
বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে হিনা সৌরশক্তিনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারের জোরালো সমর্থক। তিনি গ্রামীণ এলাকায় সৌরচালিত পাম্প এবং বিভিন্ন কমিউনিটি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের পক্ষে সক্রিয় প্রচার চালিয়েছেন। তাঁর এই তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ ভারতের বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতির আওতায় নির্ধারিত Nationally Determined Contributions (NDCs) পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশ অ-জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎস, বিশেষ করে সৌরশক্তি থেকে অর্জনের লক্ষ্য স্থির করেছে ভারত। বর্তমানে হিনা মীরাটের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এন ব্লক (N Block)-এর সহযোগিতায় তাঁর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
 
একটি অনুষ্ঠানে হিনা সাইফি
 
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে হিনার সঙ্গে রয়েছেন দেশের আরও ১৬ জন তরুণ জলবায়ু যোদ্ধা। তাঁরা রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে নিজেদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরছেন এবং অন্য তরুণদেরও এই আন্দোলনের অংশ হতে অনুপ্রাণিত করছেন। ‘উই দ্য চেঞ্জ’ অভিযানের এই মুখগুলো জলবায়ু ন্যায়বিচার ও পরিবেশ সুরক্ষার পথে নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
 
এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন অভিনেত্রী দিয়া মির্জা, যিনি রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব কর্তৃক নিযুক্ত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDGs)-এর অ্যাডভোকেট। দিয়া মির্জা বলেছেন, হিনা ও তাঁর সহযোদ্ধাদের গল্প তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে এবং এই গল্প আরও অনেক মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
 
ভারতে রাষ্ট্রসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর মতে, এই অভিযান মানুষকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উদ্ভাবনী ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে এটি রাজ্য সরকার ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে অর্থবহ উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করছে এবং তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা টেকসই ও প্রকৃতিবান্ধব উদ্ভাবনকে সম্মান জানাচ্ছে।
 
হিনার ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামও সমান অনুপ্রেরণাদায়ক। সিসোলা গ্রামে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাত্র একটি সরকারি বিদ্যালয় ছিল। তাঁর বাবা-মা প্রথমে গ্রামের বাইরে মেয়েকে পড়তে পাঠাতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর মা মেয়ের স্বপ্নকে সমর্থন করেন এবং তাঁকে খাতাউলিতে এক পিসির বাড়িতে পাঠান। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও ছিল আরেক বড় চ্যালেঞ্জ। পরে এন ব্লক সংস্থার মুকেশ কুমার তাঁর পরিবারকে রাজি করিয়ে কলেজে পড়ার সুযোগ করে দেন।
 
হিনা সাইফি
 
সিসোলা গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। অধিকাংশ পুরুষ পাথরের খনিতে কাজ করতেন, আর নারী ও শিশুরা স্থানীয় ফুটবল তৈরির কারখানায় কাজ করে একটি ফুটবল সেলাইয়ের জন্য মাত্র ২০ টাকা উপার্জন করতেন। দারিদ্র্যের কারণে শিশুশ্রম ছিল সেখানে সাধারণ ঘটনা। হিনাকেও অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। পড়াশোনার খরচ চালাতে তিনি একটি ফুটবল কারখানায় খণ্ডকালীন কাজও করেছিলেন।
 
এই কঠিন পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠার ফলে শিক্ষা, দারিদ্র্য ও পরিবেশের অবনতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক তিনি উপলব্ধি করেন। তিনি দেখতেন, আবর্জনা পুকুর ও নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা খোলা জায়গায় পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামে পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করতেন এবং নর্দমাগুলো আবর্জনায় ভরে থাকত। হিনা বুঝতে পারেন, প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হবে শিক্ষার মাধ্যমেই। তাই তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেন।
 
২০১৮ সালে হিনা তাঁর গ্রামের প্রথম মেয়ে হিসেবে লখনউয়ে একটি পরিবেশবিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বায়ুদূষণ এবং এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। গ্রামে ফিরে তিনি নারী ও শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন দল গঠন করেন এবং পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য ২০ জন মেয়েকে নিয়ে একটি বিশেষ দল তৈরি করেন। বর্তমানে উইমেন ক্লাইমেট কালেক্টিভ-এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় মঞ্চেই পরিবেশের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
 
সম্প্রতি হিনা ‘সূরজ সে সমৃদ্ধি’ (সূর্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধি) নামে একটি নতুন গ্রামীণ উদ্যোগ শুরু করেছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি গ্রামবাসীদের অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করছেন। পাশাপাশি, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সচেতন করে তুলতে বিদ্যালয়গুলোতে পোস্টার অঙ্কন ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। তাঁর বিশ্বাস, যে কোনও সামাজিক পরিবর্তনে নারীর ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিবেশগত সংকটের প্রথম ও সবচেয়ে বড় প্রভাব তাঁদের জীবনেই পড়ে।
 
হিনা সাইফি
 
আজ হিনার প্রচেষ্টার ফলে সিসোলা গ্রামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এখন অভিভাবকেরা তাঁদের মেয়েদের গ্রামের বাইরে কলেজে পাঠাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী। গ্রাম পরিচ্ছন্ন হয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে এবং পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। হিনা নিয়মিতভাবে স্থানীয় গ্রামপ্রধানদের সঙ্গে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।
 
মীরাটের একটি প্রত্যন্ত ও অনুন্নত গ্রামের মেয়ে থেকে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে স্বীকৃত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা হিনা সাইফির এই যাত্রা প্রতিটি সেই তরুণীর জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প, যিনি বাধা অতিক্রম করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান। তাঁর জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প, শিক্ষা এবং তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ শুধু একজন মানুষের জীবনই নয়, একটি পুরো সমাজকেও বদলে দিতে পারে।


শেহতীয়া খবৰ