১৯২৭ সালে ইন্দোনেশিয়া সফরকালে মধ্য জাভার ঐতিহাসিক বোরোবুদুর মন্দিরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আলোকচিত্রের জন্য পোজ দিচ্ছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ফাইল ছবি)
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস কেবল কূটনীতি বা বাণিজ্যের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে যে গভীর সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও মানবিক বন্ধনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম প্রধান নির্মাতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৭ সালে তাঁর জাভা, বালি এবং তৎকালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ সফর শুধু একটি বিদেশ ভ্রমণ ছিল না; এটি ছিল দুই প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক সংলাপের সূচনা, যার প্রভাব আজও শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী এবং ভারত–ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের নানা স্তরে অনুভূত হয়।
বিশিষ্ট গবেষক ও ভ্রামণিক শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য আওয়াজ দ্য ভয়েজকে বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক ছিল কেবল একটি বিদেশ সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল দুই প্রাচীন সংস্কৃতির আন্তরিক আত্মিক সংলাপ। তিনি ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ করে সেখানকার শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের সৃষ্টিশীল ভাবনায় ধারণ করেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার নৃত্যশৈলী, চারুকলা ও নান্দনিক প্রকাশভঙ্গি তাঁর নৃত্যনাট্য এবং শিল্পচিন্তায় সুস্পষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ঐতিহাসিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে তাঁর সেই সফর। বর্তমান বছরটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইন্দোনেশিয়া সফরের শতবর্ষ, এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আমাদের দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে স্মরণ, মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।”
বিশ্বভারতীর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যেই ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে বের হন। সফরসূচিতে ছিল জাভা, বালি, সুরাবায়া, যোগ্যাকার্তা-সহ একাধিক অঞ্চল।সেখানে স্থানীয় রাজপরিবার, শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় মতবিনিময় হয়। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন, ভারতীয় সভ্যতার বহু প্রাচীন ধারা ইন্দোনেশিয়ার সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নতুন রূপে বিকশিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন, ভারতীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করলেও ইন্দোনেশিয়া তার নিজস্ব সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব ও সৃজনশীলতাকে স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই উপলব্ধিই তাঁর সাংস্কৃতিক দর্শনকে আরও প্রসারিত করে এবং ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের এই সফরের অন্যতম স্থায়ী অবদান হলো ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী বাটিক শিল্পকে শান্তিনিকেতনে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।বাটিক হলো মোম-প্রতিরোধী (Wax Resist Dyeing) রঞ্জনপ্রযুক্তির মাধ্যমে কাপড়ে নকশা তৈরির এক প্রাচীন শিল্পরীতি, যার বিকাশ মূলত জাভা দ্বীপে। সফরকালে এই শিল্পের নান্দনিকতা ও সম্ভাবনায় মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ এর কৌশল শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন।
পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর কলাভবনের শিল্পীরা ভারতীয় লোকঐতিহ্য, প্রকৃতি, নকশা ও আধুনিক শিল্পভাবনার সঙ্গে বাটিককে মিলিয়ে গড়ে তোলেন এক স্বতন্ত্র ধারা, ‘শান্তিনিকেতন বাটিক’। আজ এই শিল্প পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পরিচিত হস্তশিল্প হিসেবে দেশ-বিদেশে সমাদৃত। শাড়ি, দোপাট্টা, স্কার্ফ, পোশাক, ব্যাগ, ওয়াল হ্যাঙ্গিং এবং গৃহসজ্জার নানা সামগ্রীতে শান্তিনিকেতন বাটিকের ব্যবহার যেমন জনপ্রিয়, তেমনি এটি বহু কারুশিল্পীর জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
রবীন্দ্রনাথ শুধু বাটিক শিল্পেই অনুপ্রাণিত হননি; জাভানিজ ও বালিনিজ নৃত্য, সংগীত এবং নাট্যকলাও তাঁর শিল্পচিন্তায় গভীর ছাপ ফেলেছিল।ইন্দোনেশিয়ার নৃত্যকলার ধীর, সংযত অথচ অত্যন্ত অভিব্যক্তিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, হাতের সূক্ষ্ম মুদ্রা, চোখের ব্যবহার এবং ছন্দময় শরীরী ভাষা তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। পরবর্তীকালে তাঁর নৃত্যনাট্যগুলির মঞ্চভাবনা, দলগত পরিবেশনা, পোশাক-পরিকল্পনা এবং নন্দনতত্ত্বে এই প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।বিশ্বভারতীর নৃত্যশিক্ষাতেও ইন্দোনেশীয় নৃত্যধারার বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।
বিশিষ্ট গবেষক ও ভ্রামণিক শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
অন্যদিকে, জাভার গামেলান সংগীতের ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের নান্দনিক বিন্যাস রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তাকেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। যদিও রবীন্দ্রসংগীতে গামেলান সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি, তবু সংগীতের সামগ্রিক নন্দনতত্ত্বে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষা।ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় শিক্ষানায়ক কি হাজার দেওয়ান্তারা শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মুক্ত শিক্ষাদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। প্রকৃতির মাঝে শিক্ষা, সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চা, স্বাধীন চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ভিত্তি করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘তামান সিসোয়া’ শিক্ষা আন্দোলন।পরবর্তীকালে এই আন্দোলন ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। আজও দেশটির শিক্ষাক্ষেত্রে দেওয়ান্তারার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ সেখানে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রনীতির চেয়ে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং মানবিক। তাঁর মতে, শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানই বিভিন্ন জাতিকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসে।এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে। স্বাধীনতার পরও দুই দেশের মধ্যে শিল্পী, গবেষক, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের নিয়মিত বিনিময় হয়েছে। বিশ্বভারতী এবং ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সময়ে সময়ে গড়ে উঠেছে সহযোগিতামূলক কর্মসূচি।
১৯২৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের শতবর্ষ উপলক্ষে ২০২৬–২৭ সালে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় একাধিক স্মারক কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সেমিনার ও গবেষণা সম্মেলন, বাটিক শিল্পের প্রদর্শনী ও কর্মশালা, জাভানিজ, বালিনিজ ও রবীন্দ্রনৃত্যের যৌথ পরিবেশনা, বিশ্বভারতী ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচি, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও পাণ্ডুলিপির প্রদর্শনী এবং দুই দেশের শিল্পী, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক উৎসব।এই উদ্যাপনের মূল লক্ষ্য শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে জানানো যে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছে শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর।
শান্তিনিকেতনে বাটিক শিল্পের আগমন
বিশ্বায়নের যুগে যখন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তখন রবীন্দ্রনাথের আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের ধারণা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সৃজনশীল বিনিময়ই বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণের পথ নির্মাণ করতে পারে।
শান্তিনিকেতন ও ইন্দোনেশিয়ার শতবর্ষের এই সম্পর্ক সেই বিশ্বাসেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাটিক শিল্প থেকে শিক্ষাদর্শ, নৃত্য থেকে সাহিত্য, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক যোগাযোগ আজও দুই দেশের মানুষকে এক অদৃশ্য সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। শতবর্ষ উদ্যাপন সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে।