রথ থামে এক মুসলিম ভক্তের সমাধির সামনে, পুরীর রথযাত্রায় সম্প্রীতির এক অনন্য অধ্যায়

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
পুরীর বড়দণ্ডে মহাপ্রভু জগন্নাথের রথ যাত্রা এবং মুসলিম কবি শালবেগের ঐতিহ্য
পুরীর বড়দণ্ডে মহাপ্রভু জগন্নাথের রথ যাত্রা এবং মুসলিম কবি শালবেগের ঐতিহ্য
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

পুরীর বড়দণ্ডে তখন জনসমুদ্র। হাজার হাজার হাত টানছে মহাপ্রভু জগন্নাথের নন্দীঘোষ রথ। চারদিক মুখরিত, "জয় জগন্নাথ" ধ্বনিতে। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা সেই বিশাল রথ আচমকাই থেমে যায় একটি নির্দিষ্ট স্থানে। না, এটি কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, আবার কোনও আকস্মিক ঘটনাও নয়। বরং শতাব্দীপ্রাচীন এক ঐতিহ্যের নিঃশব্দ পালন। কারণ, সেখানেই রয়েছে মহাপ্রভুর এক অনন্য ভক্ত, মুসলিম কবি শালবেগের সমাধি।

ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন নজির খুব কমই দেখা যায়। যে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে আজও অ-হিন্দুদের প্রবেশাধিকার নেই, সেই মন্দিরেরই অধিষ্ঠাত্রী দেবতা প্রতি বছর রথযাত্রার সময় থেমে যেন শ্রদ্ধা জানান এক মুসলিম ভক্তকে। এই ঘটনাই পুরীর রথযাত্রাকে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে আটকে রাখে না; বরং একে পরিণত করে সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীকে।
 
মহাপ্রভুর এক অনন্য ভক্ত, মুসলিম কবি শালবেগের সমাধি
 
ইতিহাসের পাতা জানায়, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবেদার জাহাঙ্গীর কুলি খানের এক হিন্দু ব্রাহ্মণ স্ত্রী ছিলেন। তাঁদের সন্তান শালবেগ জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও, মায়ের কাছেই প্রথম শুনেছিলেন মহাপ্রভু জগন্নাথের লীলাকথা। সেই শৈশবের গল্পই তাঁর মনে জন্ম দেয় গভীর ভক্তির বীজ।
 
পরবর্তীকালে তিনি মুঘল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এক যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, চিকিৎসায় ফল না মেলায় তাঁর মা তাঁকে জগন্নাথদেবের নাম স্মরণ করতে বলেন। এক রাতে স্বপ্নে মহাপ্রভুর দর্শন লাভের পর অলৌকিকভাবে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই ঘটনার পর শালবেগ জীবনের বাকি সময় জগন্নাথ ভক্তি ও ভজন রচনায় নিজেকে নিবেদন করেন। তাঁর লেখা অসংখ্য ওড়িয়া ভজন আজও ওড়িশার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
 
কিন্তু ভক্তি যত গভীরই হোক, জন্মপরিচয় তাঁর সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুসলিম হওয়ায় তিনি কোনও দিন জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি পাননি। তবু তাঁর বিশ্বাসে কোনও ভাঙন ধরেনি। দূর থেকেই তিনি তাঁর প্রভুকে ভালোবেসেছেন, গান বেঁধেছেন, চোখের জলে আর প্রার্থনায় তাঁকে অনুভব করেছেন।
 
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শালবেগের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, মহাপ্রভুর রথ যেন অন্তত একবার তাঁর দুয়ারে আসে। লোকবিশ্বাস বলে, তাঁর মৃত্যুর পরের রথযাত্রায় নন্দীঘোষ রথ তাঁর সমাধির সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়। বহু চেষ্টা করেও রথ আর এগোয়নি। পরে শালবেগের নাম উচ্চারণ করে জয়ধ্বনি দেওয়ার পর আবার রথ চলতে শুরু করে। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আজও রথযাত্রার সময় শালবেগের সমাধির সামনে কিছু সময়ের জন্য রথ থামানো হয়।
 
মহাপ্রভুর এক অনন্য ভক্ত, মুসলিম কবি শালবেগের সমাধি
 
ইতিহাসবিদেরা এই ঘটনাকে লোকঐতিহ্যের অংশ বলেই ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এর তাৎপর্য অন্যত্র। তাঁদের বিশ্বাস, ভক্তির শক্তি ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে। তাই শালবেগের সমাধি আজ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের এক নীরব স্মারক।
 
এমন এক সময়ে, যখন ধর্মের পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজনের নানা ঘটনা সমাজকে অস্থির করে তোলে, তখন পুরীর এই ঐতিহ্য এক ভিন্ন বার্তা বহন করে। এটি শেখায়, বিশ্বাসের ভাষা আলাদা হতে পারে, উপাসনার পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আন্তরিক ভক্তি ও মানবতার মূল্য সব ধর্মেই সমান।
 
প্রতি বছর তাই যখন মহাপ্রভুর রথ শালবেগের সমাধির সামনে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়, তখন শুধু একটি প্রাচীন রীতি পালিত হয় না। সেই ক্ষণিকের বিরতিতে যেন নতুন করে উচ্চারিত হয় ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক চিরন্তন বাণী, মানুষকে বড় করে তোলে তার ধর্ম নয়, তার হৃদয়। আর সেই হৃদয়ে যদি থাকে নির্মল ভালোবাসা, তবে সেখানে ভেদরেখা টিকে থাকে না; থাকে শুধু সম্প্রীতির আলো।