বছরে ১৫০০ কেজি বিশুদ্ধ মধু উৎপাদন: মৌচাষ করে বেকার যুবকদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন ২২ বছরের বিকি হুসেন
Story by Munni Begum | Posted by Aparna Das • 14 h ago
বছরে ১৫০০ কেজি বিশুদ্ধ মধু উৎপাদন: মৌচাষ করে বেকার যুবকদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন ২২ বছরের বিকি হুসেইন
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
সরকারি চাকরির আশায় বসে না থেকে মৌচাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন অসমের এক ২২ বছর বয়সি উদ্যোগী যুবক। মাত্র একটি মৌচাষের বাক্স দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর এই যাত্রা বর্তমানে এক বৃহৎ উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় দেড় টন বিশুদ্ধ ও প্রাকৃতিক মধু উৎপাদন করে তিনি বার্ষিক লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, অসমের বাইরেও মধু, মৌমাছি এবং মৌচাষের বাক্স সরবরাহ করে তিনি আজ রাজ্যের বহু বেকার যুবকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন। এই সফল তরুণ উদ্যোগপতির নাম বাইহাটা চারিআলির বিহদিয়া গ্রামের বিকি হুসেন।
বিকি হুসেন প্রথমদিকে মুকালমুয়ার খাদি ও গ্রামীণ শিল্প বোর্ড এবং খানাপাড়ার কৃষি বিভাগের কাছ থেকে মৌচাষের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরির জন্য বহু চেষ্টা করার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে, নিজস্ব ব্যবসা শুরু করলেই প্রকৃত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। সেই সময় বাজারে ভেজাল ও রাসায়নিক মিশ্রিত মধুর আধিক্য দেখে তিনি সমাজকে বিশুদ্ধ মধু সরবরাহ করার সংকল্প নেন।
এই প্রসঙ্গে 'আওয়াজ – দ্য ভয়েস'-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে উদ্যোগী যুবক বিকি হুসেন বলেন, “আজকাল বাজারে বিশুদ্ধ ও প্রাকৃতিক মধু সহজে পাওয়া যায় না। ক্রেতারা প্রাকৃতিক মধু চান, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাসায়নিক মিশ্রিত মধুই কিনতে বাধ্য হন, যা মানবদেহে নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। মানুষের এই সমস্যার সমাধান করে স্বাস্থ্যসম্মত বিশুদ্ধ মধু সরবরাহ করার উদ্দেশ্যেই আমি মৌচাষের ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবি।”
মাত্র ২,২০০ টাকা মূলধন দিয়ে একটি মৌচাষের বাক্স কিনে বিকি তাঁর এই যাত্রার সূচনা করেছিলেন। শুরুতে তাঁকে বহু বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কখনও মৌমাছি উড়ে চলে যেত, আবার কখনও মৌচাক নষ্ট হয়ে যেত। তবুও তিনি হতাশ হননি। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বিকি বলেন, “প্রথমদিকে অনেক মৌমাছি উড়ে চলে গিয়েছিল। সেই ঘটনাগুলো আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, যদি ধৈর্য ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করে যাই, তাহলে একদিন নিশ্চয়ই সাফল্যের মুখ দেখব।”
মৌমাছির বাক্স পরীক্ষা করছেন বিকি হুসেন
অবশেষে তাঁর ধৈর্যের ফল মিলেছে। বর্তমানে বিকি হুসেনের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৭৫টি মৌচাষের বাক্স রয়েছে এবং গ্রীষ্মকালে এই সংখ্যা বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০-তে পৌঁছায়। একটি বাক্সে সাধারণত ৮টি করে মৌচাক থাকে। সেই মৌচাক থেকে নতুন কলোনি তৈরি করে তিনি ধাপে ধাপে নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন। তিনি মূলত "এপিস সেরানা ইন্ডিকা" নামের দেশীয় প্রজাতির মৌমাছি দিয়ে মধু উৎপাদন করেন। এছাড়াও গ্রীষ্মকালে বেশি উৎপাদনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার থেকে "এপিস মেলিফেরা লিগুস্টিকা" নামের ইতালীয় প্রজাতির মৌমাছিও কিনে আনেন।
দুই প্রজাতির পার্থক্য ব্যাখ্যা করে বিকি বলেন, “দেশীয় প্রজাতির মৌমাছি একটি বাক্সে ৮ থেকে ১০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত মধু উৎপাদন করে। অন্যদিকে, ইতালীয় প্রজাতির মৌমাছি থেকে ৩০ থেকে ৪০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত উৎপাদন পাওয়া যায়। তবে অসমের বর্ষাকালের আর্দ্র আবহাওয়ায় ইতালীয় প্রজাতির মৌমাছি বেশি দিন বাঁচে না, কিন্তু দেশীয় মৌমাছিগুলো আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খুব ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ইতালীয় প্রজাতি থেকে উৎপাদন বেশি হলেও বর্ষার সময় প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাবে অনেক মৌমাছির মৃত্যু হয়। তাই প্রতি বছর নতুন করে ইতালীয় প্রজাতির মৌমাছি কিনে আনতে হয়।”
পাশের রাজ্যগুলিতে মৌমাছি ও মৌচাষের বাক্স সরবরাহ করছেন বিকি হুসেন
শুধু ‘নর্থ ইস্ট হানি’ নামে নিজস্ব ব্র্যান্ডে মধু বিক্রি করেই বিকি হুসেন থেমে থাকেননি। তিনি মৌমাছি, মৌচাষের বাক্স এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মশলা সরকারি বিভাগ, এনজিও এবং কৃষক উৎপাদক সংগঠন (FPO)-এর কাছেও সরবরাহ করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর কাছে মাল্টি ফ্লোরা, মাস্টার্ড, লিচু, জাম এবং আসাম লেমনসহ বিভিন্ন স্বাদের ও বিভিন্ন ধরনের মধু পাওয়া যায়। এছাড়াও তিনি অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতেও মৌচাষের সামগ্রী সরবরাহ করছেন। একই সঙ্গে বহু আগ্রহী ব্যক্তিকে মৌচাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথও দেখাচ্ছেন।
সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গে বিকি জানান, তিনি খাদি বোর্ড থেকে ১০টি এবং কৃষি বিভাগ থেকে ১টি মৌচাষের বাক্স অনুদান হিসেবে পেয়েছিলেন। মৌমাছির বংশবৃদ্ধি সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি বাক্সে থাকা ৮টি মৌচাকের কিছু অংশ আলাদা করে নতুন বাক্সে রাখলে সেখানে নতুন কলোনি গড়ে ওঠে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই নতুন কলোনিতে মৌমাছিরা নিজেরাই নিজেদের জন্য একটি ‘রানি মৌমাছি’ তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কলোনির সংখ্যা বাড়িয়ে বিকি আজ এত বড় পরিসরে মধু উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতীকী ছবি
বর্ষাকালে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাব হলে মৌমাছিদের বাঁচিয়ে রাখতে তাদের চিনি মিশ্রিত রস খাওয়ানো হয়। তবে সেই সময় কোনও মধু উৎপাদন করা হয় না। তিনি স্পষ্ট করে জানান, প্রকৃত মধু শুধুমাত্র ফুলের রস থেকেই তৈরি হয়, কোনও কৃত্রিম খাদ্য থেকে নয়। তাই বিশুদ্ধ মধু উৎপাদনের জন্য অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত ফুলের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রকৃতি ফুলে-ফলে ভরে ওঠায় এই সময়েই মধুর উৎপাদন সর্বাধিক হয়।
তবে এই ব্যবসায় যে কোনও চ্যালেঞ্জ নেই, তা নয়। মৌচাষে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, সে সম্পর্কে বিকি বলেন, “‘স্মল বিটল হাইভ’ নামে এক ধরনের ক্ষতিকর পোকা মৌচাকে ডিম পাড়ে এবং এক রাতের মধ্যেই সেখান থেকে জন্ম নেওয়া লার্ভা পুরো মৌচাক নষ্ট করে দেয়। এছাড়া পিঁপড়ে, মৌখেকো পাখি, টিকটিকি এবং বড় ভীমরুলের আক্রমণও মৌচাষিদের জন্য সাধারণ সমস্যা। তাই মৌমাছির সুরক্ষা এবং বাক্সগুলির পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর রাখতে হয়। প্রতি দু'দিন অন্তর মৌচাকগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হয়।”
সহযোগীর সঙ্গে বিকি হুসেন এবং মৌচাষের জন্য প্রস্তুত করা বাক্সগুলি
সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে বর্তমানে বিকি মৌচাষের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা আয় করছেন। তাঁর এই উদ্যোগে আরও দুইজন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ব্যবসার পাশাপাশি বিকি তাঁর MBA-র পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
অসমে মৌচাষির সংখ্যা এখনও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মৌচাষের ক্ষেত্রে অসমে অপরিসীম সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ যদি সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এই কাজে নামেন, তাহলে তিনি অবশ্যই স্বনির্ভর হতে পারবেন। এখানে শুধু মধু বিক্রি করেই নয়, নতুন কলোনি, মৌচাক এবং মৌচাষের বাক্স বিক্রি করেও ভালো আয় করা সম্ভব।”
মৌচাষের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি দলের সঙ্গে বিকি হুসেন
ভবিষ্যতে নিজের এই ব্যবসার পরিধি আরও সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে বিকি হুসেনের। বর্তমানে তাঁর উৎপাদিত মধুর প্রতি কিলোগ্রামের বাজারদর ৬০০ টাকা। মাত্র একটি বাক্স দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রাই আজ তাঁকে আত্মনির্ভরতার এক সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে একটি ছোট উদ্যোগের মাধ্যমেও যে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যায়, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই নবপ্রজন্মের উদ্যোগী যুবক। বিকি হুসেনের এই সাফল্যের গল্প নিঃসন্দেহে অসমের বহু বেকার যুবক-যুবতীকে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যেতে নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে।