জামিয়ায় রিফাহ ন্যাশনাল বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬: ১৮ রাজ্য, ৫০ খাতের মিলনমেলায় উদ্যোক্তাদের নতুন দিশা
আওয়াজ দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি
দেশে উদ্যোক্তা বিকাশ, উদ্ভাবন এবং শিল্প-বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে রিফাহ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আরসিসিআই) এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ (সিআইই)-এর যৌথ উদ্যোগে নয়াদিল্লির ড. এম. এ. আনসারি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো ‘রিফাহ ন্যাশনাল বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬’। দিনব্যাপী এই জাতীয় সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫০০-রও বেশি শিল্পপতি, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, বিনিয়োগকারী এবং তরুণ উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেন।
এই কনক্লেভে দেশের ১৮টি রাজ্য এবং ৫০টিরও বেশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়। আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অভিন্ন মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারবেন, নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ অন্বেষণ করবেন এবং ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন।
‘রিফাহ ন্যাশনাল বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠানের একটি ছবি
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাদ হাবিবের পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর প্রধান অতিথিদের স্বাগত জানানো হয় এবং তাঁদের স্মারক তুলে দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
স্বাগত ভাষণে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপের প্রধান অধ্যাপক (ড.) রিহান খান সূরি বলেন, ভারতে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প জগতের মধ্যে দৃঢ় অংশীদারিত্ব অত্যন্ত জরুরি। তিনি শিক্ষার্থীদের স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রিফাহ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস. আমিনুল হাসান সম্মেলনের মূল ভাবনা তুলে ধরে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোক্তাদের একটি জাতীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করাই সংগঠনের লক্ষ্য, যাতে তাঁরা ব্যবসা সম্প্রসারণ, পরামর্শ, বিনিয়োগ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ লাভ করতে পারেন।
‘রিফাহ ন্যাশনাল বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠানের একটি ছবি
অনুষ্ঠানে জামাআতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি সৈয়দ সা'আদতুল্লাহ হুসাইনি, শাহিন গ্রুপ অফ ইনস্টিটিউশন্সের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল কাদির এবং এমএসএমই ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফ্যাসিলিটেশন অফিস, ওখলার যুগ্ম পরিচালক ড. আর. কে. ভারতী বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা ভারতের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি যুবসমাজকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
কনক্লেভে দেশ-বিদেশের একাধিক বিশিষ্ট শিল্প বিশেষজ্ঞ তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। হিমালয়া ওয়েলনেস কোম্পানির সভাপতি ড. এস. ফারুক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলির সাফল্য, নেতৃত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ এবং উদ্ভাবনের ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করেন। অন্যদিকে সর্বোকন সিস্টেমস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা হাজি কমরুদ্দিন নিজের উদ্যোক্তা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তরুণদের উৎপাদন শিল্প ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
দুবাই-ভিত্তিক বারকোর গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন ডিরেক্টর ড. ফয়জ রহমান আব্বাসি ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
‘রিফাহ ন্যাশনাল বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠানের একটি ছবি
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মেহতাব আলম রিজভি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প জগতের পারস্পরিক সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভর করে তোলা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি এই উদ্যোগের জন্য রিফাহ চেম্বারের প্রশংসা করেন।
সম্মেলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ‘ইন্ডাস্ট্রি জোন ইন্ট্রোডাকশন’, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যবসার পরিচয় তুলে ধরেন এবং সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। এই পর্বে বিজনেস ম্যাচমেকিংয়ের মাধ্যমে একাধিক নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষক সংস্থাও তাঁদের পণ্য ও পরিষেবার প্রদর্শনী করেন, যার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নতুন ব্যবসায়িক মডেল এবং সহযোগিতার সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন।
দুপুরের পর আয়োজিত বি-টু-বি বৈঠকগুলিতে বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, ডিস্ট্রিবিউটরশিপ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মতো বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি স্টার্টআপ এবং নতুন ব্যবসা নিয়ে বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশেষভাবে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের তাঁদের উদ্ভাবনী ভাবনাকে সফল উদ্যোগে রূপান্তরিত করার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এই অধিবেশনের সঞ্চালনা করেন রিফাহ কর্ণাটকের সভাপতি সৈয়দ মুমতাজ মনসুরি।
অনুষ্ঠানে ‘বিজনেস লিড শেয়ারিং’ এবং ‘অপরচুনিটি শেয়ারিং’ শীর্ষক বিশেষ পর্বও আয়োজিত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের ব্যবসায়িক সুযোগ, সম্পদ এবং সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব নিয়ে মতবিনিময় করেন। এর ফলে উদ্যোক্তারা নতুন যোগাযোগ স্থাপন এবং নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কার্যকর সুযোগ লাভ করেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে রিফাহ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব মির্জা আফজল বেগ বলেন, দেশজুড়ে উদ্যোক্তাদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সংগঠনটি ভবিষ্যতেও নিরন্তর কাজ করে যাবে। অন্যদিকে দিল্লি প্রদেশের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন উপস্থিত সকল অতিথি, বক্তা, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, পৃষ্ঠপোষক এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কনক্লেভের আহ্বায়ক সৈয়দ ইউনুস বলেন, রিফাহর লক্ষ্য দেশের উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, বিনিয়োগকারী এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের এমন একটি অভিন্ন মঞ্চে নিয়ে আসা, যেখান থেকে নতুন চিন্তাভাবনা, নতুন ব্যবসা এবং নতুন সম্ভাবনার জন্ম হবে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।