বোতল অক্ষত, ভিতরে দাঁড়িয়ে আস্ত জাহাজ! আউশগ্রামের অঞ্জনের হাতের জাদুতে বিস্মিত সবাই

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
অঞ্জন বিশ্বাস
অঞ্জন বিশ্বাস
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

প্রথম দর্শনে মনে হবে, নিশ্চয়ই কাঁচের বোতল কেটে আবার জোড়া লাগানো হয়েছে। কারণ, সরু মুখের একটি বোতলের ভিতরে কীভাবে এত নিখুঁত একটি কাঠের জাহাজ ঢুকতে পারে! কিন্তু হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলেই বিস্ময় আরও বাড়ে। কোথাও কাঁচ কাটার দাগ নেই, বোতল ভাঙার কোনও চিহ্নও নেই। অথচ তার ভিতরে মাস্তুল, পাল, ডেক, সব মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ জাহাজ।
 
এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম ব্লকের শিবদা গ্রামের তরুণ শিল্পী অঞ্জন বিশ্বাস।দিনের বেশিরভাগ সময় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করলেও অবসর পেলেই তিনি ডুবে যান তাঁর ছোট্ট কর্মশালায়। কাঠের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরো, সুতো, আঠা আর কয়েকটি সূক্ষ্ম যন্ত্রই তাঁর ভরসা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জাহাজের প্রতিটি অংশ আলাদা করে তৈরি করেন। তবে আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় তার পরে।
 
অঞ্জন বিশ্বাস
 
জাহাজটি কখনওই একসঙ্গে বোতলের ভিতরে ঢোকে না। প্রতিটি অংশ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সরু মুখ দিয়ে একে একে বোতলের ভিতরে প্রবেশ করানো যায়। বিশেষ লম্বা যন্ত্রের সাহায্যে ভিতরে গিয়ে প্রতিটি অংশ জোড়া লাগে। মাস্তুল ভাঁজ করা অবস্থায় ঢুকে পরে ভিতরে দাঁড় করানো হয়। পাল টানটান করে বাঁধা হয় সূক্ষ্ম সুতোর সাহায্যে। সামান্য ভুল হলেই ভেঙে যেতে পারে কয়েক দিনের পরিশ্রম। তাই প্রতিটি ধাপেই দরকার অসীম ধৈর্য, স্থির হাত এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।
 
অঞ্জন বিশ্বাস জানালেন, এই শিল্প শেখানোর মতো কোনও প্রতিষ্ঠান তিনি পাননি। ইউটিউব, বই কিংবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে বছরের পর বছর নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই এই দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাঁর কথায়, "একটি কাজ শেষ করতে কখনও কয়েক দিন, কখনও তারও বেশি সময় লাগে। তাড়াহুড়ো করলে এই কাজ করা যায় না। ধৈর্যই এখানে সবচেয়ে বড় মূলধন।"
 
শিল্পের প্রতি এই ভালোবাসার শুরু অবশ্য ছোটবেলাতেই। তাঁর বাবা একজন দক্ষ কাঠশিল্পী। বাবার কাজ দেখেই কাঠের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। তবে বাবার মতো একই ধরনের কাজ না করে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছাই তাঁকে বোতলের ভিতরে জাহাজ তৈরির এই বিরল শিল্পের দিকে নিয়ে আসে।
 
অঞ্জন বিশ্বাসের তৈরি শিল্পের একটি ছবি
 
শুধু বোতলের ভিতরে জাহাজই নয়, কাঠের নান্দনিক দেওয়াল ঘড়ি, শোপিস, এমনকি একটি ডিমের খোলের উপর সূক্ষ্ম কারুকাজ করেও নজর কেড়েছেন তিনি। প্রতিটি শিল্পকর্মেই ফুটে ওঠে তাঁর নিখুঁত হাতের কাজ এবং সৃজনশীলতার পরিচয়।
 
প্রথমে নিজের শখের বশেই শুরু করেছিলেন এই শিল্পচর্চা। এখন সেই কাজের খবর ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তাঁর তৈরি শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে কাঁচের বোতলের ভিতরে তৈরি জাহাজ উপহার হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি শিল্পকর্মের দাম প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে হলেও, অঞ্জনের কাছে এর প্রকৃত মূল্য টাকায় নয়, মানুষের বিস্ময় আর ভালোবাসায়।
 
আউশগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামের এই তরুণ শিল্পী যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন, শিল্পের জন্য বড় শহর বা দামী কর্মশালার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একাগ্রতা, ধৈর্য আর নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস। তাই আজ একটি সাধারণ কাঁচের বোতলও তাঁর হাতে হয়ে উঠছে বিস্ময়ের ক্যানভাস।


শেহতীয়া খবৰ