শিক্ষাকে ঢাল করে প্রতিবন্ধী তসলিমার জীবন সংগ্রাম; পাশে দাঁড়ালেন খাকি উর্দির ভেতরে থাকা মানবিক পুলিশ আধিকারিক
নুরুল হক / আগরতলা
১৭ বছরের তাসলিমা শুধু চেয়ে থাকে। তাসলিমা শুধু চেয়ে থাকে কারণ সে মুখে কিছু বলতে পারেনা। সে কানে কিছু শুনতে পারেনা। সে শুধু আশেপাশের পরিবেশের ইশারা বুঝে এবং সেই ইশারাকে নিজের মনের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের মতো করে কাজ করতে পারে। জন্মগতভাবে মূক বধির তাসলিমার ডান হাতও অক্ষম।
শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী তাসলিমা অত্যন্ত মেধাবী। মাধ্যমিকে ৮০ শতাংশ নম্বর পেয়ে সবাইকে চমক লাগিয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ঠেলে শুধুমাত্র দুচোখ ভরে চেয়ে চেয়েই নিজের অন্ধকার জীবনকে শিক্ষার আলোকে আলো উজ্জ্বল করে তোলার সংগ্রামী নেমেছে তাসলিমা।
ত্রিপুরার প্রত্যন্ত জম্পুই জলা ব্লকের প্রমোদনগর উপজাতি অধ্যুষিত ভিলেজের তসলিমা আক্তার এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তাসলিমার বাবা সৈয়দ আলী একজন দিনমজুর। তাদের খুবই দরিদ্র পরিবার। বাড়িতে মাথা গুঁজে থাকার মত একটি মজবুত ঘরও নেই। এই হতদরিদ্র পরিবারে তসলিমার শিক্ষার প্রতিফলন নতুন আসার সঞ্চয় করেছেন। নিজের মানসিক শক্তি দিয়ে তাসলিমা ক্রমাগত পরিস্থিতির সাথে সংগ্রাম করছে।
তাসলিমা আক্তার পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। সে বরাবরই প্রথম শ্রেণী থেকে স্কুলে অত্যন্ত ভালো ফলাফলের মধ্য দিয়ে এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হয়েছে। নিজের বা হাত দিয়ে লিখেই মাধ্যমিক পরীক্ষায় সে নম্বর পেয়েছিল ৮০ শতাংশ। কোন ধরনের শিক্ষক এবং সহযোগিতা ছাড়াই সে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে চলেছে। ত্রিপুরা বোর্ডের অধীনে আগামী ২৫ তারিখ থেকে তসলিমা আক্তারের বোর্ড পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।
তাসলিমা আক্তার
তসলিমার এই জীবন সংগ্রামের কাহিনীর খবর পেয়ে সম্প্রীতি তার বাড়িতে ছুটে যান বিশ্রামগঞ্জ থানার ওসি অজিত দেববর্মা। ত্রিপুরা পুলিশের ইন্সপেক্টর অজিত দেববর্মা বরাবরই পরোপকারী এবং মানবিক কাজ করতে পছন্দ করেন। মুসলিম পরিবারের দরিদ্র প্রতিবন্ধী ছাত্রের মেধার কথা শুনে খাকি উর্দির ভেতরে থাকা মানবিকতার টানে তাসলিমার বাড়িতে ছুটে যান অজিত দেববর্মা।
অজিত দেববর্মা তাসলিমার জন্য ফল, পুষ্টিকর খাদ্য সহ কিছু শিক্ষা সামগ্রী নিয়ে যান। তাসলিমাকে সামান্য আর্থিক সাহায্য করেন এবং পরীক্ষায় যাতে সে ৯৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হতে পারে তার জন্য দুহাত তুলে দোয়া করেন। অজিত দেববর্মা বলেন তাসলিমার মেধা এবং মানসিক শক্তি তাকে বিচলিত করেছে।
বিশ্রামগঞ্জ থানার ওসি অজিত দেববর্মা ও তাঁর সহকর্মীরা তাসলিমাকে সাহায্য প্রদান করা মুহূর্তের একটি দৃশ্য
তিনি আশাবাদী তাসলিমা আগামী দিনে ৯৫ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করবেন। মাধ্যমিক পাস করার পর কলেজে ভর্তি সহ যাবতীয় বিষয়ে যে কোন ধরনের সহযোগিতায় তাসলিমা এবং তার পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্রামগঞ্জ থানার ওসি অজিত দেববর্মা।
তিনি সরাসরি মেয়েটিকে এবং তার বাবাকে নিজের ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার দিয়েছেন। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মুসলিম গরিব পরিবারের মেয়ের শিক্ষা অগ্রসরে জনজাতি পুলিশ আধিকারিকের এই সহযোগী মনোভাব নেট দুনিয়ায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।