কাশ্মীরের ম্লান হতে বসা এক অপূর্ব শিল্প: কর-এ-কলমদানি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
কাশ্মীরের ম্লান হতে বসা এক অপূর্ব শিল্প: কর-এ-কলমদানি
কাশ্মীরের ম্লান হতে বসা এক অপূর্ব শিল্প: কর-এ-কলমদানি
 
দয়ারাম বশিষ্ঠ

কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এমন বহু অনন্য শিল্পে ভরপুর, যেগুলো আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই বিস্মৃতপ্রায় রত্নগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘কর-এ-কলমদানি’, এক মোহময় ও সূক্ষ্ম সৌন্দর্যে ভরা শিল্প, যার নামও আজ অনেকেই শোনেননি। অথচ একসময় এই শিল্পই ছিল কাশ্মীরের পরিচয়ের জ্বলজ্বলে প্রতীক। এই হারিয়ে যেতে থাকা শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতে এগিয়ে এসেছেন শ্রীনগরের বিশিষ্ট কারিগর ফয়াজ আহমদ জান, যিনি শুধু নিজের উত্তরাধিকার বাঁচিয়ে রাখছেন না, বিশ্বমঞ্চেও পৌঁছে দিচ্ছেন কাশ্মীরের এই অমূল্য ঐতিহ্যকে।
 
কর-এ-কলামদানি মূলত এক ধরনের 'পেপার মাশে শিল্প ' (গলানো কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি শিল্পকর্ম), যার জন্ম ত্রয়োদশ শতকে কাশ্মীরে বলে ধারণা করা হয়। ‘কলামদানি’ অর্থাৎ কলম রাখার বাক্স, এই শব্দ থেকেই শিল্পের নামের উৎপত্তি, কারণ প্রথমে এই শিল্পের মাধ্যমে তৈরি হতো কলমদানের দৃষ্টিনন্দন নকশা। সেই সময় কাশ্মীরের বিশেষ ‘খোসুর কাগজ’ তার উৎকৃষ্ট মানের জন্য সুদূর দেশেও বিখ্যাত ছিল। এই কাগজ দিয়ে বানানো কলমদানের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়, আর সেগুলিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে শুরু হয় সূক্ষ্ম নকশার কলা, যা পরবর্তীতে কর-এ-মুনাক্কাশি বা অলংকরণ শিল্প নামেও পরিচিত হয়।
 

ফয়াজ আহমদ জান জানান, প্রায় ৭০০ বছর আগে মীর সৈয়দ হামরানি ইরান থেকে এই শিল্প ভারতবর্ষে নিয়ে আসেন। প্রাথমিকভাবে এটি শালের গায়ে নকশা আঁকতে ব্যবহার হতো, পরে ধীরে ধীরে কাঠ ও কাগজেও এই শিল্পের প্রয়োগ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কাশ্মীরি পরিচয়ের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়। কিন্তু যন্ত্রের আগ্রাসন ও যুবসমাজের আগ্রহ কমে যাওয়ায় আজ এই শিল্প বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
 
ফয়াজ আহমদ জানের সঙ্গে এই শিল্পের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের। তাঁর পূর্বপুরুষ, পরদাদা সবদার জান, দাদা আলিজান এবং বাবা মোহাম্মদ ওসির জান, সকলেই এই শিল্পে দক্ষ ছিলেন। শিশু বয়সে তিনি ঘর ভরা কাগজ, রং ও তুলি দেখে বড় হয়েছেন। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা ফয়াজ মাত্র ১৫ বছর বয়সেই এই শিল্প শেখা শুরু করেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবার মৃত্যু ঘটে, ফলে পরিবারের ওপর নেমে আসে কঠিন সঙ্কট। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর মা ফাতিমা চরকা চালিয়ে পশমিনা শাড়ির জন্য সুতো বানাতেন, মা-ছেলের কঠোর পরিশ্রমই তাঁদের নিঃশ্বাস ধরে রেখেছিল।
 
পেপার মাশে শিল্প তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধৈর্য ও পারদর্শিতা দাবি করে। প্রথমে পুরনো কাগজ পানিতে ভিজিয়ে নরম করা হয়, তারপর সেটিকে ভালো করে পিষে ময়দার মতো মসৃণ করা হয়। এরপর তাতে চালের মাড় মিশিয়ে এমন এক উপাদান তৈরি করা হয়, যা শক্ত ও টেকসই হয়।
 
ফয়াজ আহমদ
 
এই মিশ্রণ বিভিন্ন ছাঁচে ঢেলে পছন্দসই আকার দেওয়া হয়। শুকিয়ে গেলে শুরু হয় কাশ্মীরি ঐতিহ্যবাহী চিত্রাঙ্কনের সূক্ষ্ম কাজ। ফয়াজ জানান, এতে প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি ধাতব ও অ্যাক্রেলিক রঙও ব্যবহৃত হয়। কখনো সোনা–রুপোর গুঁড়োও ব্যবহার করা হয়, যা শিল্পকর্মকে আরও মূল্যবান করে তোলে। শেষে বার্নিশ লাগানো হয়, যাতে উজ্জ্বলতা বাড়ে এবং জল থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায়।
 
ফয়াজ আহমদ জানের তৈরি শিল্পকর্ম এখন দেশ–বিদেশে পরিচিত। মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দেয়ালেও তাঁর করা কর-এ-কলামদানির নকশা দেখা যায়, যা যাত্রীদের সামনে কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক গভীরতা তুলে ধরে। ইউরোপে এই শিল্পের বিশেষ কদর রয়েছে। সেখানকার মানুষ কাঠ ও কাগজের তৈরি এই সাজসজ্জার সামগ্রী মখমলের কাপড়ে জড়িয়ে উপহার হিসেবে দেন। জুয়েলারি বক্স ও বিশেষ নকশার বাক্সগুলোর আলাদা চাহিদা রয়েছে।
 
ফয়াজ অতীত স্মরণ করে বলেন, একসময় রং তৈরি করতে প্রথমে পাথর গুঁড়ো করতে হতো, অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ, কিন্তু সেই রঙের উজ্জ্বলতা ছিল অতুলনীয়। এখন বেশিরভাগ রং মেশিনে তৈরি হয়, ফলে কাজ সহজ হয়েছে, তবু তিনি চেষ্টা করেন পুরোনো কৌশল ও নকশা টিকিয়ে রাখতে।
তাঁর একাগ্রতা ও শিল্পনৈপুণ্য দেশও স্বীকৃতি দিয়েছে, ১৯৮৫ সালে ন্যাশনাল মেরিট সার্টিফিকেট, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে পদ্মশ্রী প্রাপ্ত হন তিনি। এগুলো কেবল একজন শিল্পীর সম্মান নয়, কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী এক মহান শিল্পের পুনর্জাগরণের সম্মানও বটে।
 
ফয়াজ কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন। দেশের বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ ও সরকারি সহায়তা তাঁকে এগিয়ে যেতে আরও সাহস জুগিয়েছে। তাঁর বানানো জিনিসপত্র ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
 
ফয়াজ আহমদ জানের বিশ্বাস, যদি আজও এই শিল্পের সঠিক পরিচর্যা ও উৎসাহ পাওয়া যায়, তবে কর-এ-কলামদানি আবার তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে পারে। তিনি আশাবাদী যে নতুন প্রজন্ম এই শিল্পকে শুধু জীবিকার উপায় হিসেবে নয়, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখবে। তাঁর জীবনই প্রমাণ করে, সত্যিকারের আগ্রহ ও নিষ্ঠা থাকলে কঠিনতম পরিস্থিতিতেও ঐতিহ্য ও শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।