“বাড়ির ক্রাফ্ট রুম থেকে বিশ্বমঞ্চ: ফারহীন ও তহরীনের অনন্য সাফল্যের গল্প”

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
“বাড়ির ক্রাফ্ট রুম থেকে বিশ্বমঞ্চ: ফারহীন ও তহরীনের অনন্য সাফল্যের গল্প”
“বাড়ির ক্রাফ্ট রুম থেকে বিশ্বমঞ্চ: ফারহীন ও তহরীনের অনন্য সাফল্যের গল্প”
 
ফারহান ইসরাইলি / জয়পুর 

প্রতিভা কোনো সীমান্ত বা চারদেয়ালের বন্দি নয়। কিন্তু যখন সেই প্রতিভার সঙ্গে পরিবারের সহায়তা আর সোশ্যাল মিডিয়ার ডানা যুক্ত হয়, তখন তা আকাশ ছুঁয়ে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করে। গোলাপি নগরী জয়পুরের এক সাধারণ বাড়ি থেকে শুরু হওয়া এই গল্প আজ ডিজিটাল দুনিয়ার ইতিহাসে রচনা করেছে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এই গল্প দুই সহোদরা, ফারহীন খানম এবং তহরীন খানমের, যারা রঙিন কাগজ, কাঁচি, গ্লু আর ছোট্ট ছোট্ট মুক্তোর জাদু দিয়ে শুধু কোটি মানুষের মন জয় করেননি, বরং ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে ঘরে বসেই গড়ে তুলেছেন সাফল্যের এক বিরাট সাম্রাজ্য, যার প্রতিধ্বনি আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে সাত সমুদ্রের ওপারেও।
 
হিজাবপরিহিতা এবং ধর্মীয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ এই দুই বোন আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার নাম, বিশেষত তাদের জন্য যারা নিজের পরিচিতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে আধুনিক পৃথিবীতে এগিয়ে যেতে চায়। ফারহীন ও তহরীনের এই পথচলার শিকড় লুকিয়ে আছে তাদের শৈশবে, আর তাদের মা নওয়েদা খানমের স্নেহময় শিক্ষায়।
 

ছোটবেলা থেকেই তারা দেখতেন, মা ঘরের পুরোনো, অব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে কীভাবে দারুণ সুন্দর আর্ট ও ক্রাফ্ট তৈরি করেন। সেখান থেকেই দুই বোনের মনে জন্ম নেয় শিল্পের প্রতি গভীর আকর্ষণ। ফারহীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, এই কাজের জন্য তারা কোনো প্রফেশনাল ট্রেনিং নেননি। বরং মাকে কাজ করতে দেখতেই দেখতেই হাতের দক্ষতা আর মনের সূক্ষ্মতা তাদের ভিতর গেঁথে যায়।
 
তহরীন জানান, মায়ের এই প্রতিভা সেই সময় শুধু ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, ছিল না নিজের কাজ বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগও। কিন্তু দুই বোন যখন প্রযুক্তির শক্তিকে বুঝলেন, তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন, মায়ের শেখানো এই সম্পদকে তারা পৌঁছে দেবেন পৃথিবীর প্রতিটি কোণে।
প্রায় তিন বছর আগে ছোট্ট এক উদ্যোগ হিসেবে যেটির সূচনা হয়েছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে এক বিশাল ডিজিটাল গাঁথায়।
 
শুরুর দিনগুলো ছিল অনেক কঠিন। তহরীন হেসে বলেন, প্রথম ভিডিও আপলোড করার পর বহুদিন পর্যন্ত কোনো ভিউই আসেনি। কিন্তু মা সবসময়ই বলতেন, “পরিশ্রম কখনোই বৃথা যায় না।” সেই উৎসাহই আজ তাদের সাফল্যের দৃঢ় ভিত্তি। বর্তমানে তহরীন খানমের ইউটিউব চ্যানেলে ১.৩৪ কোটি (১৩.৪ মিলিয়ন) এর বেশি সাবস্ক্রাইবার, আর ফারহীন খানমের চ্যানেলকেও অনুসরণ করছেন ১.১ মিলিয়নের বেশি মানুষ।
 
ফারহীন ও তহরীনের ক্র্যাফ্টরুম এবং ইউটিউব ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া  থেকে পাওয়া ' বাটন' ও সার্টিফিকেটের ছবি
 
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও স্ন্যাপচ্যাট মিলিয়ে তাদের ভক্তসংখ্যা এখন কয়েক কোটিতে পৌঁছে গেছে। তহরীনের চ্যানেলের দরজায় এখন ‘ডায়মন্ড প্লে বাটন’-এর আগমনঘণ্টা বেজে উঠেছে, আর দুজনের কাছেই আগেই রয়েছে সিলভার ও গোল্ড প্লে বাটন। ‘হিন্দুস্তান বুক অব রেকর্ডস’ থেকে শুরু করে ‘আইকনিক আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট ক্রিয়েটর অব দ্য ইয়ার’, অগণিত সম্মান তাদের সাফল্যের সাক্ষী।
 
এই সফলতার আড়ালে রয়েছে পরিবারজুড়ে এক বিশাল পরিশ্রম। তাদের বাবা রইস খান এবং ভাই জুনায়েদ ও শোয়েব খান ছিলেন তাদের যাত্রার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। প্রযুক্তিগত কাজ সামলানো ভাই জুনায়েদ জানান, স্ক্রিনে যে এক মিনিটের ভিডিও দেখা যায়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু ঘণ্টার পরিশ্রম। প্রথমে ক্রাফ্ট তৈরি, তারপর রেকর্ডিং, এডিটিং এবং শেষে যুক্ত হয় ভয়েসওভার, যাতে শিশুরাও সহজে প্রতিটি ধাপ বুঝতে পারে। দুই বোন মিলে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫টি ভিডিও আপলোড করেন, এবং এখন পর্যন্ত তারা ৫৫০০টিরও বেশি ভিডিও বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
 
ফারহীন ও তহরীনের গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তাদের সরলতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে অটল থাকা। দুজনই এম.এ. পর্যন্ত পড়াশোনা করার পাশাপাশি পাঁচ বছরের ‘আলিমা কোর্স’ সম্পন্ন করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে তারা হিজাব পরে হাজির হন।
 

ফারহীনের মতে, দ্বীনি ও দুনিয়াবি তালিমের সমন্বয় মানুষের চিন্তাভাবনাকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। সেই প্রভাব তাদের কাজেও দেখা যায়; সরলতা, শালীনতা এবং সুন্দর মানসিকতা। তিনি বলেন, “আগাতে গেলে কখনোই নিজেকে বদলানোর প্রয়োজন অনুভব করিনি। আমরা যেমন, ঠিক তেমনভাবেই নিজেদের তুলে ধরেছি।” এ কারণেই অনেক মেয়ে তাদের বার্তা পাঠায়, “আপনারা যদি ঘরে বসে এত কিছু করতে পারেন, তাহলে আমরাও পারব।”
 
বিয়ের পরও ফারহীনের পথচলা এক মুহূর্তও থামেনি। বরং তার স্বামী মোহাম্মদ আরিফ এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে আলাদা একটি স্টুডিও উপহার দিয়ে তার স্বপ্নকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন। কোটি টাকার আয় এবং প্রচার-প্রসারের মাঝেও দুই বোন আজও মাটির মানুষ।
 
তারা তাদের ভিডিওতে বানানো বেশিরভাগ ক্রাফ্ট বিক্রি করেন না, বরং আশেপাশের বাচ্চাদের মাঝে বিলিয়ে দেন। তাদের বিশ্বাস, বাচ্চাদের মুখের হাসিই তাদের প্রকৃত আয়। এখন তাদের নতুন লক্ষ্য, স্কুলে ক্রাফ্ট প্রতিযোগিতা আয়োজন করা, যেখানে সেরা কাজ করা বাচ্চাদের সাইকেল, মোবাইলের মতো সুন্দর পুরস্কার দেওয়া হবে। এক অনুষ্ঠানে অভিনেতা শক্তি কপুরের হাতে সম্মান গ্রহণ করতে করতে তারা যেমন আবেগে ভরে উঠেছিলেন, তেমনই মর্যাদা পেয়েছিলেন তাদের পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতার।
 
এক অনুষ্ঠানে অভিনেতা শক্তি কপুরের হাতে সম্মান গ্রহণের মুহূর্তে
 
জয়পুরের এই দুই কন্যার গল্প প্রমাণ করে, সাফল্য সবসময় বিশাল স্টুডিও বা দামি যন্ত্রপাতি থেকে জন্মায় না। কখনো কখনো তা শুরু হয় ঘরের ছোট্ট একটি টেবিল থেকে, যেখানে থাকে মায়ের শিক্ষা আর দুই বোনের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা, যা মিলেমিশে তৈরি করে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস।