মানজিৎ ঠাকুর
আপনি কোনো একদিন আমার সঙ্গে মধুপুরে চলুন। জামুই স্টেশন পেরোতেই দু’দিকের বন আর উঁচুনিচু উপত্যকার যে অঞ্চল শুরু হয়, সেখানে আপনি এক অনন্য দৃশ্য দেখবেন। ঝাঁঝা, শিমুলতলা, জসিডিহ এবং মধুপুর, এই পুরো পথজুড়ে রেললাইনের দু’পাশে উপত্যকাগুলো ঘন জঙ্গলে ভরা, আর এখন, ফাল্গুনের উষ্ণতায় সেই জঙ্গলে ফুটছে পলাশ।
ফাল্গুনের শীতল সকালগুলো যখন ধীরে ধীরে কমে আসে আর বাতাসে বসন্তের হালকা সুবাস মেশে, তখন পৃথিবীতে ঘটে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। হঠাৎ কোথা থেকে যেন আমাদের জঙ্গল, খেতের আল, নদীর তীর আর পাথুরে ভূমিতে জ্বলে ওঠে লাল-কমলা আগুনের মতো দীপ্তি। কিন্তু এ আগুন ধ্বংসের নয়, এ সৌন্দর্যের, জীবনের উৎসবের। এ-ই হলো পালাশ।
সংস্কৃতে যার নাম কিঞ্চুক বা ঢাক, ইংরেজিতে 'ফ্লেম অব দ্য ফরেস্ট'। বসন্তের সবচেয়ে উজ্জ্বল সূচক। যখন অধিকাংশ গাছ তাদের পাতা ঝরিয়ে ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন পলাশ তার নিরাবরণ শাখায় আগুনমাখা রূপে জ্বলে ওঠে। মনে হয়, ধরিত্রী যেন নিজের জন্য গেরুয়া রঙের পোশাক বুনে নিয়েছে।
প্রাচীন সাহিত্যে পালাশের উল্লেখ পাওয়া যায় গভীর আবেগে। অমরকোষে বলা হয়েছে, কিঞ্চুকই পলাশ। কালিদাস তাঁর কাব্যে পালাশকে বসন্তের প্রতীক হিসেবে অসংখ্যবার ব্যবহার করেছেন। ঋতুসংহারে তিনি লিখেছেন, “প্রফুল্ল কিঞ্চুকবনের শোভা ভরে উঠেছে” ফুলে ভরা কিঞ্চুক-বনের দীপ্ত সৌন্দর্যের কথা। কালিদাসের কাছে পলাশ ছিল না শুধু একটি গাছ, বরং ছিল ঋতুর এক জীবন্ত চরিত্র। মেঘদূত-এর প্রকৃতিবর্ণনাতেও পলাশের উজ্জ্বলতা ছায়ার মতো অনুসরণ করে, প্রেম, বিরহ আর সৌন্দর্যের নীরব সাক্ষী হয়ে।
হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি, রাজস্থানের রুক্ষ ভূমি থেকে মধ্য ভারতের ঘনজঙ্গল, সবখানেই পলাশ তার লাল-কমলা স্বাক্ষর রেখে গেছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ জীবনে পালাশ যেন মাটির সঙ্গে মিশে আছে। বসন্ত এলেই গ্রামের শিশুরা পালাশ কুড়িয়ে আনে, আর নারীরা সেই ফুল পূজার নিবেদন হিসেবে ব্যবহার করেন।
শিবলিঙ্গে অর্পিত পলাশ ফুলের মালা (ফাইল)
হোলির সময় আমরা অনেক পলাশ জোগাড় করতাম। ডাঁটি থেকে ফুল আলাদা করে চুন দিয়ে জলে ফুটিয়ে যে রং তৈরি হত, তা ছিল অত্যন্ত টেকসই ও কোমল। সেই রঙে গ্রামের প্রবীণ মানুষ থেকে শুরু করে তরুণেরা, সবাই রাঙা হয়ে যেতেন।
যে যুদ্ধ পলাশির নামকে ইতিহাসে অমর করেছে, সেই পলাশির নামকরণ হয়েছিল এই গাছের ঘনবৃক্ষরাজির কারণে। অথচ আজ সেখানে একটি পলাশগাছও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের উপনয়নের সময় ভিক্ষাটনের দণ্ড হিসেবে যে কাঠ হাতে ধরানো হয়েছিল, তা-ও ছিল পালাশের। বৈদিক যুগে পলাশকে অত্যন্ত পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে গণ্য করা হত। শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লেখ আছে, যজ্ঞকার্যে পালাশের কাঠ ও সমিধা শুচিতা ও পবিত্রতার ধর্মে ব্যবহৃত হতো।
প্রাচীন ভারতে পলাশ ব্যবহার করে তৈরি করা হতো প্রাকৃতিক রং। হোলিতে ব্যবহৃত সেই গেরুয়া রং ছিল ত্বকের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। আজও অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে এ রং প্রস্তুত করার প্রথা অটুট আছে, মানুষকে যেন শেকড়ে ফেরার আহ্বান জানায়।
লোকসাহিত্যে পালাশের গুরুত্ব অপরিসীম। ভোজপুরি, অবধি, বুন্দেলী, ছত্তিশগড়ি, এসব আঞ্চলিক গানে পলাশ হয়ে ওঠে কখনো প্রেয়সীর লাল ওড়না, কখনো বিরহিণীর হৃদয়ের জ্বালা। পলাশের ফুল যে দেখে, সে অজান্তেই থমকে দাঁড়ায়। লাল-কমলা পাপড়িতে সূর্যের দীপ্তির মতো এক প্রগাঢ় আলো লুকিয়ে থাকে। এ রং শুধু দৃষ্টিকেই নয়, আত্মাকেও উজ্জ্বল করে তোলে। পলাশের ছাল, ফুল ও বীজ আয়ুর্বেদে বহু যুগ ধরে ব্যবহৃত, রক্তশোধন, প্রদাহনাশ এবং নানা ত্বক-রোগে এর প্রয়োগ রয়েছে।
প্রতীকী ছবি
পলাশ শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এ এক ঋতু। এ বসন্তের আহ্বান, ইতিহাসের স্মৃতি, সাহিত্যের পঙ্ক্তি, লোকসংগীতের সুর, তপস্যার আগুন। এর ফুলে লুকিয়ে আছে ভারতের আত্মা- রঙে, বিশ্বাসে, ঐতিহ্যে, সৌন্দর্যে।
পরের বার কোনো নির্জন পথে আগুনের মতো দহনে ফুটে থাকা পলাশ দেখলে কিছুক্ষণ থেমে যান। বুঝে নিন, এ শুধু প্রকৃতির দৃশ্য নয়, বরং শতাব্দীর ধারাবাহিকতায় বহমান ভারতীয় সংস্কৃতির এক নীরব কবিতা, যা শব্দহীন হয়েও অসীম কথা বলে যায়।