বালুচরির নীরব বদল: যেখানে একদিন মিলেছিল হিন্দু–মুসলিমের জীবনছবি

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
বালুচরির নীরব বদল: যেখানে একদিন মিলেছিল হিন্দু–মুসলিমের জীবনছবি
বালুচরির নীরব বদল: যেখানে একদিন মিলেছিল হিন্দু–মুসলিমের জীবনছবি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

গাঢ় নীল মালবেরি সিল্কের জমির উপর আজও রামায়ণ–মহাভারতের দৃশ্য বোনা হয় বিষ্ণুপুরের তাঁতে। কিন্তু সেই বালুচরি আর পুরোটা আগের মতো নেই। বিষ্ণুপুরের প্রবীণ বয়নশিল্পী শ্রীমন্ত দাস স্মৃতিচারণায় বলেন, “ছোটবেলায় বালুচরির আঁচলে বাবু-বিবি, হুঁকো ধরা রাজপুরুষ, রেলগাড়িতে বসা মেমসাহেব দেখতাম। এখন সেসব নকশা আর বোনা হয় না।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, বালুচরির বদল শুধু নকশার নয়, এ এক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের গল্প।
 
বালুচরি শাড়ির জন্ম আজকের বাঁকুড়ায় নয়। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী তীরবর্তী বালুচর অঞ্চলে এই শিল্পের সূচনা। ১৭৫৫ সালে ওলন্দাজ কারখানার অধিকর্তা লুই তাইলেফার্তের নথিতে বালুচরের নকশাদার রেশমের উল্লেখ মেলে। বহরমপুর ও জিয়াগঞ্জের মধ্যবর্তী বালুচর, বাহাদুরপুর, রামডহর ও বালিগ্রাম, এই অঞ্চলগুলি মিলেই ইতিহাসে ‘বালুচর’ নামে পরিচিত হয়।
 
বালুচরি শাড়ির নকশার একটি ছবি
 
১৭০৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরিয়ে আনার পর এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে বড়সড় পরিবর্তন আসে। নবাবি দরবার, ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা, অভিজাত সমাজের বিলাসী জীবনযাত্রা, সব মিলিয়ে বস্ত্রনকশায় ঢুকে পড়ে সমকালীন সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ। পেশোয়াজ-পরা বাবু-বিবি, হুঁকো ধরা রাজপুরুষ, বিলিতি রেলগাড়িতে চড়া মেমসাহেব কিংবা আলবোলার নলের মতো উপাদান জায়গা করে নেয় বালুচরি শাড়ির পাড় ও আঁচলে।
 
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এই বালুচরিতে মানুষের প্রতিকৃতি থাকলেও ধর্মীয় বাধা এখানে বড় হয়ে ওঠেনি। মুসলিম ও হিন্দু, উভয় সম্প্রদায়ের অভিজাত সমাজেই এই শাড়ির জনপ্রিয়তা ছিল। হাজারদুয়ারি মহাফেজখানায় সংরক্ষিত ফারসি নথিতে আফরাজউন্নিসা বেগমের বিবাহ উপলক্ষে ছয়টি বুটিদার বালুচরি কেনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ইউরোপেও বালুচরির কদর কম ছিল না- ১৮৫৫ সালে প্যারিসের প্রদর্শনী থেকে লন্ডনের সাউথ কেনসিংটন মিউজিয়ামে পৌঁছয় এই শাড়ি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে সারদাদেবীর বালুচরি পরিহিত রূপের কথা লিখেছেন।
 
এই শিল্পের কারিগররাও ছিলেন সমাজের প্রান্তিক মানুষ-কৈবর্ত, মাল, বাগদি, চাঁড়াল, মুসলিম যুগী ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্পীরা। নকশা অনুযায়ী সুতো বাঁধার কাজ যাঁরা করতেন, তাঁরা পরিচিত ছিলেন ‘নকশাবন্দ’ নামে। বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন ও হিন্দু–মুসলিম সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ছাপ স্পষ্ট ছিল বালুচরির নকশায়। গবেষক ক্ষিতিমোহন সেন যে যুক্তসাধনার ধারার কথা বলেছেন, বালুচরি যেন তারই এক বস্ত্ররূপ।
 
পরবর্তীকালে শিল্পটি বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত হলে মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বালুচরি নতুন রূপ পায়। রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতের কাহিনি, পোড়ামাটির মন্দির অলংকরণ এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব শিল্পভাবনা বয়নশৈলীতে প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে হিন্দু আখ্যানই হয়ে ওঠে বালুচরির মূল ভাষা।
 
বালুচরি শাড়ির নকশার একটি ছবি
 
আজকের বাজারে সেই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। চকচকে জরির ব্যবহারে তৈরি স্বর্ণচরি শাড়ির চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে বালুচরির সেই নরম, বর্ণময় রেশমি সুর, যেখানে ধরা থাকত সমকালীন সমাজজীবনের বহুস্বর। বিষ্ণুপুরের তাঁতিপাড়ায় আজ আর দেখা যায় না আলবোলার নল, রেলকামরার বাবু-বিবি কিংবা হুঁকো খাওয়া রাজপুরুষের নকশা।
 
অথচ বালুচরি শাড়ির কাঠামো ও বৈচিত্র্য আজও বিস্ময় জাগায়। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৫ ফুট, চওড়ায় ৪২ ইঞ্চি এই শাড়ির আঁচল হয় ২৪ থেকে ৩২ ইঞ্চি লম্বা। গবেষিকা চিত্রা দেব বালুচরির অলংকরণকে ভাগ করেছেন চিত্র, কল্কা, পাড় ও বুটি- যার মধ্যে চিত্র অংশের নকশা অন্য শাড়িতে বিরল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে মীনাকরী বালুচরি, স্বর্ণচরি, রূপশালি, মধুমালতী কিংবা দ্রৌপদী বালুচরির মতো নতুন ধারাও।
 
সরকারি ভৌগোলিক তকমা, জাতীয় পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতির ফলে বালুচরির ভবিষ্যৎ হয়তো উজ্জ্বল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই উজ্জ্বলতার মধ্যে কি হারিয়ে যাচ্ছে তার বহুসাংস্কৃতিক স্মৃতি? যে বালুচরি একদিন হিন্দু ও মুসলিম সমাজজীবনের ছবি একই আঁচলে বুনেছিল, আজ তা ক্রমশ একমুখী আখ্যানেই সীমাবদ্ধ। বয়নশিল্পী ও গবেষকদের মনে তাই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, বালুচরির নকশায় কি আবার ফিরবে সেই হারানো সহাবস্থানের গল্প?