শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেট দল কয়েক দশকের সীমিত সম্পদ এবং নানা সন্ত্রাসবাদের চ্যালেঞ্জ সামলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী বাংলাকে হারিয়ে তাদের প্রথম রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে পৌঁছে এক ইতিহাস তৈরি করেছে! ১৯৫৯ সালে রঞ্জিতে তাদের অভিষেক হয়েছিল। এর পর ৬৭ বছর কেটে গেছে। এ বারেই অর্থাৎ ২০২৬ সালে প্রথম সেমি ফাইনাল ও ফাইনালে পৌঁছে আকিব নবি, আব্দুল সামাদরা এখন স্বপ্নপূরণ থেকে আর এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে।
এই ঐতিহাসিক জয়ের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন দলের পেস স্পিডার আউকিব নবী। ২৯ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় এই মরশুমে অসাধারণ গড়ে ৫৫ উইকেট নিয়েছেন, যা তাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার করে তুলেছিল। ১৯৫৯-৬০ মরসুমে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক হওয়া জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদেরকে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কয়েক দশক ধরে এই জায়গায় আসার জন্য লড়াই করতে হয়েছে।
রঞ্জিতে তাদের প্রথম জয় আসে ১৯৮২-৮৩ সালে সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে। আর তাদের প্রথম রঞ্জি ম্যাচে জয় পেতে ৪৪ বছর সময় লেগেছিল। যা এক কথায় অবিশ্বাস্য! আর নকআউটে পৌঁছানো তো এক বিরল ব্যাপার। তবে এর মাঝে জম্মু-কাশ্মীর অবিশ্বাস্য কান্ডটি ঘটিয়েছিল ২০১৩-১৪ সালে। সেবার তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। আর ২০১৫-১৬ মরসুমে পারভেজ রসুলের নেতৃত্বে তারা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মুম্বাইকে হারিয়ে হতবাক করে দিয়েছিল। কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্য অধরাই ছিল।
তবে এবার এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কোচ অজয় শর্মা এবং অধিনায়ক পারস ডোগরার নেতৃত্বে এই মরসুমে এক অসাধারণ পরিবর্তন দেখা গেছে। মুম্বাইয়ের কাছে প্রথম ম্যাচে পরাজয় সত্ত্বেও, জম্মু ও কাশ্মীর রাজস্থানের বিরুদ্ধে ইনিংস জয় এবং দিল্লি ও হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ জয়ের মাধ্যমে নকআউটে স্থান নিশ্চিত করে।
কোয়ার্টার ফাইনালে, তারা নাটকীয় প্রতিযোগিতায় মধ্যপ্রদেশকে ৫৬ রানে পরাজিত করে, যার বেশিরভাগই নবীর ১২ উইকেট শিকারের মাধ্যমে। সেমিফাইনালে, জম্মু ও কাশ্মীর তাদের প্রথম ইনিংসে ৩০২ রান করে, ঘাটতি মাত্র ২৬ রানে নামিয়ে আনে। অধিনায়ক পারস ডোগরা ১১২ বলে ৫৮ রান করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, অন্যদিকে আব্দুল সামাদ ৮৫ বলে ৮২ রানের পাল্টা আক্রমণ করেন।
রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে জম্মু ও কাশ্মীরের টিম-এর ছবি (ফাইল)
নবীও ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, ৫৪ বলে ৪২ রান করেন এবং যুধবীর সিং শেষ উইকেটে ৬৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটিতে ৩৩ রান যোগ করেন। তৃতীয় দিনে ২৫.১ ওভারে ৯৯ রানে গুটিয়ে গেলে বাংলার আশা ম্লান হয়ে যায়, ফলে জম্মু ও কাশ্মীর একটি পরিচালনাযোগ্য লক্ষ্যে পৌঁছায়। যদিও শেষ সকালে কিছু উদ্বেগজনক মুহূর্ত ছিল, যার মধ্যে প্রথম দিকের উইকেটও ছিল, সামাদের আক্রমণাত্মক মনোভাব গতিকে চূড়ান্তভাবে বদলে দেয়। আকাশ দীপের বিরুদ্ধে তার ১৮ রানের ওভার একটি টার্নিং পয়েন্ট প্রমাণিত করে এবং সেখান থেকে, জম্মু ও কাশ্মীর একটি স্মরণীয় জয় পেয়ে যায়।
সেদিন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ খেলোয়াড়, কোচ এবং সহায়তা কর্মীদের তাদের নিষ্ঠার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে এই অঞ্চলের ক্রিকেটাররা শীঘ্রই জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
ঠিকই তাই, জাতীয় দলে ইতিমধ্যে প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেছেন উমরান মালিক। যিনি ইতিমধ্যেই দ্রুততম বোলারদের অন্যতম হয়ে উঠেছেন আর পারভেজ রসুল প্রথম জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএল খেলছেন এবং আব্দুল সামাদ-এর মতো খেলোয়াড়রা আইপিএল এবং জাতীয় স্তরে খেলে রাজ্যের নাম উজ্জ্বল করে চলেছেন।
আকিব নবীর ছবি
আর আউকিব নবী-র চলতি মরসুমে দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি দলের ফাইনাল পর্যন্ত যাত্রায় মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। যিনি এই মুহূর্তে ভারতীয় দলের নির্বাচকদের কাছে নজর কাড়ার মত কাজ করে চলেছেন। জম্মু-কাশ্মীরের এই দলটা রঞ্জিতে চ্যাম্পিয়ন হোক আর নাই হোক, আগামীদিনে কিন্তু এই দলটা কিছু ক্রিকেটার ভারতীয় দলে উপহার দেওয়ার জন্য তৈরি।