মুসলিম শিল্পী শফিকুলের হাতের ছোঁয়ায় খারুপেটিয়ার মণ্ডপে জীবন্ত কেদারনাথ ধাম, কৈলাস পর্বত ও বারাণসীর ঘাট

Story by  Munni Begum | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
মুসলিম শিল্পী শফিকুলের হাতের ছোঁয়ায় খারুপেটিয়ার মণ্ডপে জীবন্ত কেদারনাথ ধাম, কৈলাস পর্বত ও বারাণসীর ঘাট
মুসলিম শিল্পী শফিকুলের হাতের ছোঁয়ায় খারুপেটিয়ার মণ্ডপে জীবন্ত কেদারনাথ ধাম, কৈলাস পর্বত ও বারাণসীর ঘাট
 
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি

ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা মানুষের মধ্যে গড়ে তোলে ঐক্যের এক অনন্য সেতু। এরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন অসমের দরং জেলার খারুপেটিয়ার এক মুসলিম শিল্পী। তাঁর নাম শফিকুল ইসলাম।
 
ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এই মুসলিম শিল্পী তাঁর দশজন মুসলিম সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ উৎসব দুর্গাপুজোর জন্য নির্মাণ করেছেন দুটি আকর্ষণীয় পুজোমণ্ডপ। তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পেয়েছে কেদারনাথ ধাম, কৈলাস পর্বত, শিবলিঙ্গের পাশাপাশি বারাণসীর ঘাটের মনোমুগ্ধকর প্রতিরূপ। শিল্পী শফিকুল ও তাঁর সহযোগীদের এই উদ্যোগ আরও একবার তুলে ধরেছে অসমের সুপরিচিত ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য।
 
খারুপেটিয়ার দুর্গাপুজোর কেদারনাথ ধাম
 
"আওয়াজ-দ্য ভয়েস"-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিল্পী শফিকুল ইসলাম জানান, “আমি ২০১২ সাল থেকেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। প্রতি বছর আমি তিন থেকে চারটি পুজোমণ্ডপ নির্মাণ করি। তবে এ বছর খারুপেটিয়ায় দুটি বৃহৎ পুজোমণ্ডপ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছি। দুটি মণ্ডপেই বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে পাহাড়, গুহা, জলপ্রপাত এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপত্যের প্রতিরূপ। এর মধ্যে একটি মণ্ডপে ৪০ ফুট উঁচু ডমরুর পাশাপাশি একটি শিবলিঙ্গ নির্মাণ করেছি। শিবলিঙ্গটিকে পাঁচটি নাগ সাপ দিয়ে বেষ্টিত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। এর পাশেই তৈরি করা হয়েছে একটি কৃত্রিম গুহা। গুহার ভিতরে থাকবে ১৮ ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তি। অন্যদিকে, খারুপেটিয়ার হনুমান মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মিত দ্বিতীয় পুজোমণ্ডপেও রয়েছে বিশেষ চমক। এখানে কেদারনাথ ধামের আদলে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু মন্দির নির্মাণের পাশাপাশি ৩০ ফুট উচ্চতার কৈলাস পর্বতের প্রতিরূপ তৈরি করা হয়েছে। এর পিছনে থাকবে ৪০ ফুট উচ্চতার ভগবান শিবের বিশাল মূর্তি। শিবের মাথা থেকে নেমে আসা জল দিয়ে দুটি প্রাকৃতিক জলপ্রপাতের মতো দৃশ্য তৈরি করা হবে।”
 
শুধু তা-ই নয়, শিল্পী শফিকুল ইসলাম আরও জানান, এই পুজোমণ্ডপে বারাণসীর বিখ্যাত ঘাটের আদলেও একটি প্রতিরূপ নির্মাণ করা হয়েছে। ঘাটটির চারপাশে থাকবে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় মন্দির। পাহাড়, গুহা, মন্দির এবং প্রবহমান জলের সমন্বয়ে গোটা পুজোমণ্ডপে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন শিল্পীরা।
 
তবে এই বিশাল আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এর নেপথ্যে থাকা শিল্পীদের ধর্মীয় পরিচয়। শফিকুল ইসলাম-সহ তাঁর দশজন সহযোগীই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। খারুপেটিয়ার বেছিমারি নগাঁওয়ের স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে নিয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি এবং মন্দিরের প্রতিরূপ তৈরি করছেন।
 
খারুপেটিয়ার দুর্গাপুজোর মণ্ডপ নির্মাণের একটি দৃশ্য
 
শিল্পী শফিকুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকেই তাঁদের দল পুজোমণ্ডপ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। দুটি মণ্ডপের জন্য নির্ধারিত বাজেট যথাক্রমে ১০ লক্ষ ও ৭ লক্ষ টাকা। মণ্ডপ নির্মাণে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন শিল্পী। গ্রামের সহজলভ্য বাঁশ, বস্তা, প্লাইউড-সহ বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করে তাঁরা তৈরি করেছেন বিশাল পাহাড়, গুহা এবং মন্দিরের প্রতিরূপ। বিশেষ করে কৃত্রিম গুহা নির্মাণে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বস্তা।
 
এই প্রসঙ্গে শফিকুল বলেন, “মণ্ডপ নির্মাণে আমি যতটা সম্ভব স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করেছি। কারণ, এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জন্যও আয়ের একটি পথ খুলে দিতে চেয়েছি। স্থানীয় কারিগররাও যাতে কাজের সুযোগ পান, সে দিকেও আমি গুরুত্ব দিয়েছি।”
 
অন্যদিকে, এমন ব্যতিক্রমী পুজোমণ্ডপ নির্মাণের পিছনে নিজের উদ্দেশ্যের কথাও জানিয়েছেন শিল্পী। তিনি বলেন, “খারুপেটিয়ার আশপাশে পাহাড়, প্রাকৃতিক জলপ্রপাত কিংবা গুহার মতো দৃশ্য দেখা যায় না। এমন দৃশ্য উপভোগ করতে গ্রামের মানুষকে অনেক দূরে যেতে হয়। কিন্তু আর্থিক বা অন্যান্য অসুবিধার কারণে গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ জীবনে একবারও এমন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পান না। তাই আমি চেয়েছিলাম, তাঁরা যেন এখানে এসেই সেই সব দৃশ্যের আভাস পেতে পারেন। পুজোমণ্ডপে এসে মানুষ যেন তাঁদের কল্পনারও বাইরে এক পরিবেশ অনুভব করতে পারেন।”
 
খারুপেটিয়ার দুর্গাপুজোর শিবলিঙ্গ ও গুহা
 
দর্শনার্থীদের বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা দিতে পুজোমণ্ডপগুলিতে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক থ্রি-ডি ইফেক্ট। পাশাপাশি প্রাচীন যুগের মশালের মতো আলোকসজ্জা এবং প্রকৃত জল ব্যবহার করে কৃত্রিম জলপ্রবাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর ফলে মন্দির, গুহা ও পাহাড়ের দৃশ্যগুলি আরও জীবন্ত হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন শিল্পী।
 
পেশায় শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি শফিকুল ইসলামের সংগীতের প্রতিও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তিনি নিজেও গান করেন। তবে দুর্গাপুজোর সময় তিনি পুজোমণ্ডপ নির্মাণের কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
 
এদিকে, পুজোমণ্ডপ পরিদর্শনে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুজো কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসন দেখভাল করবে বলে জানিয়েছেন শিল্পী শফিকুল। প্রত্যেকে যাতে নির্বিঘ্নে মণ্ডপ পরিদর্শন করতে পারেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
 
খারুপেটিয়ার দুর্গাপুজোর কৈলাস পর্বত
 
ধর্মে মুসলিম হলেও শফিকুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগীদের শিল্পীসত্তা কোনও ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় নির্মিত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও পুজোমণ্ডপগুলি বহন করছে ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং সহাবস্থানের এক সুন্দর বার্তা।
 
ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেও খারুপেটিয়ার এই দশজন মুসলিম কারিগর এবং শফিকুল ইসলামের উদ্যোগ যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের কোনও ধর্ম নেই, সম্প্রীতির কোনও সীমানা নেই। তাই দুর্গাপুজোর এই দুটি মণ্ডপ কেবল উৎসবের আকর্ষণ নয়, বরং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং অসমের সমন্বয়ের সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।


শেহতীয়া খবৰ