মোবাইলের আসক্তি দূর করে শিশুদের জন্য বক্সিংয়ের স্বপ্ন বুনছেন হায়দ্রাবাদের জুনাইদ
হায়দ্রাবাদ
সন্ধ্যা নামলেই হায়দ্রাবাদের মল্লেপল্লি মাঠে শুরু হয় এক অন্য লড়াই, মোবাইলের নেশার বিরুদ্ধে, সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে। ৩৩ বছর বয়সি বক্সার জুনাইদ মহিউদ্দিন শেখ ইউনুস দিনের শেষে নিজের পোশাকের দোকানের শাটার নামিয়ে ছুটে আসেন এই মাঠে। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে বক্সিংয়ের প্রশিক্ষণ। তাঁকে ঘিরে জড়ো হয় অসংখ্য খুদে ছেলেমেয়ে। শিশুদের মোবাইল ফোন, গেম ও রিলসের জগৎ থেকে বের করে খেলার মাঠমুখী করে তোলার লক্ষ্যেই এই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন জুনাইদ।
কাঁধের চোট তাঁর নিজের বক্সিংয়ের কেরিয়ারে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এরপরই তিনি নতুন প্রজন্মের বক্সারদের তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় ‘জুনাইদ বক্সিং ক্লাবে’। এই ক্লাবে ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কোনও ভেদাভেদ ছাড়াই ছেলেমেয়েদের বক্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের শেখানো হয় শরীরচর্চা, সুস্থ জীবনযাপন এবং নৈতিক মূল্যবোধ। জুনাইদের স্বপ্ন, মল্লেপল্লি মাঠে প্রশিক্ষণ নেওয়া এই শিশুরাই একদিন রাজ্য ও দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে।
প্রশিক্ষণার্থীদের বক্সিং শেখাচ্ছেন জুনাইদ
জুনাইদ বক্সিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠা
ছোটবেলা থেকেই বক্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল জুনাইদ মহিউদ্দিনের। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি এই খেলায় অংশ নিতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলেন। বক্সিংয়ের জগতে রাজ্য ও দেশের সম্মান বাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে কাঁধের চোট তাঁকে অনেকটাই বক্সিং থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তবে এই খেলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনও কমেনি।
কাঁধের চোট জুনাইদের মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি সংকল্প করেন, নিজে আন্তর্জাতিক স্তরে বক্সিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে না পারলেও আগামী প্রজন্মকে এই খেলায় অনুপ্রাণিত করবেন এবং তাদের এমনভাবে তৈরি করবেন, যাতে তারা একদিন দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
মোবাইলের বদলে শিশুদের হাতে বক্সিং গ্লাভস
জুনাইদ মহিউদ্দিন লক্ষ করেন, শিশুরা ক্রমশ মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মূল্যবান সময়ের অনেকটাই তারা মোবাইলে গেম খেলে এবং রিলস দেখে কাটাচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যের উপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকেই শিশুদের বক্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের বাড়ি থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা করেন এবং মল্লেপল্লি মাঠে নিজের ভাইঝিদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।
ধীরে ধীরে আরও অনেক ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসতে শুরু করে। ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনও রকম ভেদাভেদ না করেই জুনাইদ সকলকে বক্সিং শেখান। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে অনেকেই অত্যন্ত কম বয়সি। কয়েকজন মেয়ের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তা সত্ত্বেও বক্সিংয়ের প্রতি তাদের উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই খেলা ইতিমধ্যেই তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
জুনাইদ মহিউদ্দিন জানান, তিনি নিজে বক্সিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে না পারলেও তাঁর লক্ষ্য, ছাত্রছাত্রীরা যেন এই খেলায় এগিয়ে যায় এবং রাজ্য ও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনে। তিনি চান, তাঁর প্রশিক্ষণার্থীরা আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিক। শিশুদের হাতে মোবাইল ফোনের পরিবর্তে বক্সিং গ্লাভস তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন জুনাইদ। এই প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাফল্যও পেয়েছেন তিনি।
প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে জুনাইদ
সাফল্যের পথে জুনাইদের উদ্যোগ
জুনাইদ মহিউদ্দিনের কঠোর পরিশ্রমে ‘জুনাইদ বক্সিং ক্লাব’ পরিচিতি লাভ করেছে। এই ক্লাবের খুদে খেলোয়াড়রা নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা দিয়ে সকলকে অবাক করে। বিশেষ করে ছোট ছোট মেয়েরা শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। মাঠে দৌড়ানোর সময় তারা নিজেদের শরীরের ওজনের চেয়েও বেশি ওজন বহন করতে পারে।
ছেলেমেয়েরা বক্সিংয়ের আত্মরক্ষামূলক কৌশলগুলিতেও যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছে। জুনাইদ শুধু তাদের বক্সিংয়ের প্রশিক্ষণই দেন না, সুস্থ ও ফিট থাকার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চাও করান। পাশাপাশি তাদের নৈতিক বিকাশের দিকেও বিশেষ নজর দেন তিনি।
জুনাইদ বক্সিং ক্লাবের শিশুদের মধ্যে বক্সিংয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রতিদিনই তাদের দক্ষতার উন্নতি হচ্ছে এবং বিভিন্ন মঞ্চে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছে তারা। মহিউদ্দিন পরিবারেও খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে। জুনাইদের ভাই জাভেদ মহিউদ্দিন একজন ক্রিকেটার, অন্য ভাই জামিল মহিউদ্দিন ভলিবল খেলোয়াড়।
অমূল্য সম্পদ সুস্বাস্থ্য
আওয়াজ-দ্য ভয়েসের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জুনাইদ মহিউদ্দিন বলেন, একটি সুস্থ সমাজই উন্নতির ভিত্তি। তাঁর মতে, বর্তমানে শিশু ও তরুণদের মধ্যে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি ক্রমশ বাড়ছে। মোবাইলে গেম খেলা এবং রিলস দেখা এখন জনপ্রিয় সময় কাটানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অভ্যাস শিশুদের স্বাস্থ্য ও দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বক্সার জুনাইদ মহিউদ্দিন শেখ ইউনুস
জুনাইদ মহিউদ্দিন বলেন, তিনি চান শিশুদের হাতে মোবাইল ফোনের পরিবর্তে বক্সিং গ্লাভস থাকুক। তাঁর কথায়, আজকের শিশুরা সুস্থ থাকলে আগামী দিনে তারাই দেশের মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, সুস্বাস্থ্য এক অমূল্য আশীর্বাদ। কোনও ব্যক্তির অঢেল সম্পদ থাকলেও সুস্বাস্থ্য ছাড়া তার মূল্য অনেকটাই কম। স্বাস্থ্য প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার, তাই তা রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
জুনাইদ মহিউদ্দিন আরও বলেন, সমাজে নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্মের, বিশেষত মেয়েদের, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানের চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।তিনি জানান, খেলাধুলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা জীবনে উন্নতি করতে পারে। তাঁর বিশ্বাস, সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন তাঁর ক্লাবের শিশুরা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে এবং রাজ্য ও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।
খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করা জরুরি
জুনাইদ মহিউদ্দিনের মতে, খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করার জন্য সরকারি সহায়তাও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। জুনাইদ বক্সিং ক্লাবে প্রশিক্ষণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট ফি ধার্য করা নেই। অভিভাবকেরা স্বেচ্ছায় যে অর্থ দেন, তা দিয়েই বক্সিংয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়।
জুনাইদ মহিউদ্দিন বলেন, ভারত যাতে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে পারে, তার জন্য ক্রীড়াবিদদের উৎসাহ ও উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বিশ্বাস, তরুণ খেলোয়াড়দের সঠিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়া গেলে তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটবে এবং তারা সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার যোগ্য হয়ে উঠবে।