লন্ডন:
পাঁচ দশক ধরে পাঠককে টানটান গল্পের জগতে নিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ লেখক ও প্রাক্তন রাজনীতিবিদ জেফরি আর্চার আর নেই। ৮৬ বছর বয়সে সোমবার, ৫ অক্টোবর নিজের বাড়িতে লেখার টেবিলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর প্রকাশনা সংস্থা হারপারকলিন্স জানিয়েছে, লেখার কাজের মধ্যেই তিনি ‘হঠাৎ এবং শান্তিপূর্ণভাবে’ মারা যান।
আর্চারের মৃত্যু আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি আশ্চর্য সমাপতনে—তাঁর শেষ উপন্যাস ‘Adam & Eve’ প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর ঠিক পরের দিন, ৬ অক্টোবর। পঞ্চাশ বছরের লেখকজীবন শেষ করার জন্য এই বইটিকেই তিনি নিজের ‘শেষ উপন্যাস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর নিজের ওয়েবসাইটেও তিনি জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ লেখকজীবনের পর এই বইটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক কাজগুলির একটি।
আন্তর্জাতিক সাহিত্যে আর্চারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর গল্প বলার দক্ষতা। ‘Kane & Abel’, ‘The Clifton Chronicles’ এবং ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘Not a Penny More, Not a Penny Less’ তাঁকে বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তাঁর বইয়ের ৩০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, ১১৯টি দেশে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে এবং তাঁর লেখাগুলি একাধিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
লেখার পাশাপাশি আর্চারের জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরা। ১৯৬৯ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন এবং প্রায় পাঁচ বছর এমপি ছিলেন। পরে দলের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে হাউস অব লর্ডসের লাইফ পিয়ার করা হয়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে বড় ধাক্কা আসে ২০০১ সালে। ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে করা একটি মানহানির মামলায় মিথ্যা বলার ঘটনায় তিনি মিথ্যাচার ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং চার বছরের কারাদণ্ড পান। প্রায় দুই বছর পর তিনি মুক্তি পান। পরে হাউস অব লর্ডসে ফিরে গিয়ে ২০২৪ সালে অবসর নেন। কারাগারে থাকাকালীনও তিনি লেখা চালিয়ে যান এবং সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘A Prison Diary’ প্রকাশ করেন।
মৃত্যুর আগের দিনগুলিতেও থামেনি তাঁর লেখকসত্তা। শেষ বই ‘Adam & Eve’ নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে দেখা করেছেন, বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন এবং সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকা আর্চারের ক্ষেত্রে যেন তাঁর জীবন ও সাহিত্য এক জায়গাতেই এসে থামল—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হাতে ছিল কলম, আর মৃত্যুর পরদিন পাঠকের হাতে পৌঁছল তাঁর শেষ গল্প।
হারপারকলিন্সের পক্ষ থেকে তাঁকে এমন এক লেখক হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে আনন্দ দিয়েছেন। তাঁর বইয়ের বিপুল বিক্রি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের হিসাব নয়; বিশ্বজুড়ে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী পাঠকপ্রিয়তারও প্রমাণ।