ধর্ম আলাদা, উপাসনার পদ্ধতি আলাদা, কিন্তু মানুষের আনন্দ আর ভালোবাসার ভাষা এক। সেই বার্তাই যেন নতুন করে তুলে ধরেছে বীরভূমের ঝাড়খণ্ড লাগোয়া নয়নী গাঙেড্ডা গ্রাম। মুসলিম-প্রধান এই গ্রামে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা। আর্থিক অনটন ও নিজস্ব জমির অভাবে একসময় দুর্গাপুজোর আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকতে হত তাঁদের। কিন্তু এক মুসলিম পঞ্চায়েত প্রধানের মানবিক উদ্যোগ এবং গ্রামের মুসলিম বাসিন্দাদের সহযোগিতায় আজ সেই গ্রামেই ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে এই পুজো।
বীরভূমের মুরারই থানার চাতরা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত নয়নী গাঙেড্ডা গ্রামে বসবাস করেন প্রায় সাত হাজার মানুষ। গ্রামের একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গে, অন্য অংশ ঝাড়খণ্ডে। এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে, হাতে গোনা কয়েকটি হিন্দু পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত দিনমজুর। প্রতিদিনের রোজগারে সংসার চালানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা ছিল কার্যত স্বপ্নের মতো।
পুজোর মরসুমে দূর থেকে ভেসে আসত ঢাকের আওয়াজ। চারপাশে উৎসবের আনন্দ থাকলেও নিজেদের গ্রামে মণ্ডপ, প্রতিমা কিংবা পুজোর আয়োজন না থাকায় মন খারাপ করেই দিন কাটত ছোটদের। কিন্তু সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২৪ সালে।
গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলির সেই আক্ষেপের কথা উপলব্ধি করেন চাতরা পঞ্চায়েতের প্রধান গোলাবুর রহমান। দুর্গাপুজো আয়োজনের জন্য তিনি স্বেচ্ছায় নিজের জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসেন গ্রামের মুসলিম বাসিন্দারাও। জমির পাশাপাশি পুজোর আয়োজনের জন্য আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তাঁরা।
সেই জমিতেই শুরু হয় দুর্গাপুজো। মণ্ডপ তৈরি হয়, গড়ে ওঠে মৃন্ময়ী প্রতিমা, আর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায় গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলির। ২০২৪ সাল থেকে টানা তিন বছর ধরে এই গ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গোৎসব।
জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে গোলাবুর রহমানের বক্তব্য, গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মিলেমিশে বসবাস করছেন। অর্থনৈতিক সমস্যা ও জমির অভাবে কয়েকটি হিন্দু পরিবার শারদীয়ার আনন্দে অংশ নিতে পারতেন না। বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসবে তাঁরাও যাতে আনন্দ করতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। জমিটি শীঘ্রই রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন পঞ্চায়েত প্রধান।
এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হয়ে উঠেছে গ্রামের মানুষের মিলনমেলা। হিন্দু পরিবারের সদস্যরা পুজোর আয়োজন করেন, আর তাঁদের পাশে দাঁড়ান মুসলিম প্রতিবেশীরা। সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও একসঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে এক সুন্দর সামাজিক বন্ধন।
পুজো কমিটির সভাপতি তুষারকান্তি প্রামাণিক, নরোত্তম প্রামাণিক ও অরূপ মাল জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত প্রধান গোলাবুর রহমান এবং গ্রামের মুসলিম বাসিন্দারা সহযোগিতা না করলে এই পুজোর আয়োজন সম্ভব হত না। রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদানও পুজো পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা বিভাজনের আলোচনা শোনা যায়। এমন পরিস্থিতিতে নয়নী গাঙেড্ডার এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধর্মীয় পরিচয় কখনও বাধা হতে পারে না। প্রতিবেশীর আনন্দকে নিজের আনন্দ হিসেবে গ্রহণ করা, অন্যের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসা—এই সহজ মানবিক মূল্যবোধই সমাজকে আরও সুন্দর করে তোলে।
গোলাবুর রহমানের দেওয়া জমিতে আজ শুধু দুর্গাপুজো হয় না; সেখানে উদ্যাপিত হয় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। মৃন্ময়ী প্রতিমার সামনে প্রার্থনা করেন গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলি, আর সেই উৎসবের আয়োজন সফল করতে সহযোগিতা করেন তাঁদের মুসলিম প্রতিবেশীরা।
নয়নী গাঙেড্ডার এই কাহিনি তাই নিছক একটি দুর্গাপুজোর গল্প নয়। এটি আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিকতা ও সামাজিক সহযোগিতার এক সফল উদাহরণ—যেখানে ধর্মের পরিচয় আলাদা হলেও গ্রামের মানুষের পরিচয় একটাই, তাঁরা পরস্পরের প্রতিবেশী, পরস্পরের আপনজন।
কারণ, সম্প্রীতি শুধু বক্তৃতায় নয়, বাস্তব জীবনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। নয়নী গাঙেড্ডা সেই সত্যকেই তুলে ধরেছে।