প্রত্যন্ত গ্রামে পুজোতে বাঁশ-কঞ্চিতে আস্ত অরণ্য! প্রকৃতির কোলে সম্প্রীতির বার্তা, বাঘবিধবাদের সম্মান দিয়ে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা মণ্ডপজুড়ে

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 4 h ago
প্রত্যন্ত গ্রামে পুজোতে বাঁশ-কঞ্চিতে আস্ত অরণ্য! প্রকৃতির কোলে সম্প্রীতির বার্তা, বাঘবিধবাদের সম্মান দিয়ে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা মণ্ডপজুড়ে
প্রত্যন্ত গ্রামে পুজোতে বাঁশ-কঞ্চিতে আস্ত অরণ্য! প্রকৃতির কোলে সম্প্রীতির বার্তা, বাঘবিধবাদের সম্মান দিয়ে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা মণ্ডপজুড়ে
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

কলকাতা নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও থিম পুজো এবছর যেন বাড়তি পাওনা। নানা জায়গায় বিগ বাজেটের থিম পুজোর ভিড়ে এবার আলাদা করে নজর কাড়ছে সুন্দরবন লাগোয়া হাড়োয়া অন্তর্গত এক প্রত্যন্ত গ্রামের দুর্গাপুজো। এখানে চমক আছে বটে তবে তা জাঁকজমকে পরিপূর্নতা পায়নি  বরং এই পুজো যেন প্রকৃতি, পরিবেশ আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। বাঁশ-কঞ্চির শিল্পশৈলীতে গড়ে ওঠা অরণ্য, মণ্ডপজুড়ে পাখির বাসা, সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি আর সচেতনতার বার্তা ছড়ানো হয়েছে গোটা পুজোমন্ডপ জুড়ে। সব মিলিয়ে বলা যায়, হাড়োয়ার ৯১ বছরের রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো যেন এক অন্যরকম ভাবনার নাম। এবারে তাদের অনবদ্য চিন্তায় থিম, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’।

উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়া ব্লকের খাসবালান্ডা সরকারপাড়ায় এই অভিনব থিম দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। মণ্ডপের ভিতরে ঢুকলে মনে হবে, শহুরে কোলাহল ছেড়ে যেন পৌঁছে গিয়েছেন এক টুকরো সবুজ অরণ্যে। চারদিকে বাঁশ ও কঞ্চির নিপুণ কারুকাজ মুগ্ধ করবে দর্শনার্থীদের। সবুজের সমারোহ আর গাছের ডালে ডালে পাখির বাসার প্রতিরূপ যেন আলাদা আবহ তৈরি করেছে এখানে। বাবুই পাখির বাসা থেকে শুরু করে নানা পাখির আশ্রয়স্থলের অনুকরণে সাজানো হয়েছে মণ্ডপের এধার থেকে ওধার। এমনকী, অরণ্যের জীববৈচিত্র্যকে আরও জীবন্ত করে তুলতে তৈরি হয়েছে সাপের বাসার প্রতিরূপও।
 
 হাড়োয়ার ৯১ বছরের রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো
 
কিন্তু এই অরণ্য ভাবানার বার্তা দিয়েছে। যে জঙ্গল একসময় মানুষের জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করত, নির্বিচারে গাছ কাটা আর পরিবেশের পরিবর্তনে সেই অরণ্যই আজ নানা সংকটের মুখে। কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে পাখিদের আশ্রয়, কীভাবে কমছে সবুজের পরিসর তাও তুলে ধরা হয়েছে এই পুজোমন্ডপে। প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতাকেই এবছর শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে রবীন সংঘ পাঠাগার। তাদের মণ্ডপ যেন নীরবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলছে, উন্নয়নের দৌড়ে প্রকৃতিকে পিছনে ফেলে আমরা কি নিজেদের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করছি না?
 
এই পুজোর বিশেষত্ব আরও রয়েছে। অরণ্য বাঁচানোর বার্তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি, বাল্যবিবাহ রোধ। পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারও তুলে ধরা হয়েছে। মণ্ডপের বিভিন্ন জায়গায় প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে গাছ লাগানো, পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবকে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার এই উদ্যোগই পুজোটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
 
বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রচারও এই আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কম বয়সে বিয়ে দিয়ে এখনও বহু মেয়ের শৈশব অকালেই থমকে যায়। সেই ঘটনাকে রোধ করতে উৎসবের মঞ্চ থেকে থিমের মাধ্যমে আওয়াজ তোলা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে অনেকেই। একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা মনে করিয়ে দিচ্ছে, উৎসবের আসল সৌন্দর্য বিভাজনে নয়,  তা তৈরি হয় মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনে।
 
 হাড়োয়ার ৯১ বছরের রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো
 
মণ্ডপসজ্জাতেও ব্যবহার হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা মাটির সামগ্রী। সেই সঙ্গে পুরনো দিনের আসবাবপত্রের আদলে তৈরি নানা উপকরণ এবং মনোগ্রাহী আলোকসজ্জা মিলিয়ে সাজানো হয়েছে পুজো প্রাঙ্গণ। আধুনিক থিমের সঙ্গে ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এখানে নতুনত্বের সঙ্গে মিশে রয়েছে শিকড়ের টান, আর শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতিকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা।
 
তবে এই পুজোর সবচেয়ে মানবিক দিক হল, সুন্দরবনের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো। কুমিরমারি এলাকার বাঘের হামলায় স্বামী বা আত্মীয়স্বজনকে হারানো মহিলাদের সম্মান জানিয়েছে পুজো কমিটি। সুন্দরবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা এই মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ উৎসবের আনন্দের মধ্যে তুলে ধরেছে জীবনের গভীরতর অর্থ। পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায় মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দিয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা।
 
এই অনবদ্য থিম পুজোর উদ্বোধন করেন হাড়োয়ার কৃতী সন্তান তথা প্রাক্তন সেনাকর্মী অশোক মুখোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন পুজো কমিটির উদ্যোক্তা সন্দীপন দাস, অভ্র সরকার, শুভঙ্কর বিশ্বাস, শুভেন্দু দাস, পলাশ সরকার, সুব্রত মণ্ডল, কাকুলি দাস, রিমা দাস জানা, প্রিয়া দাস, খেয়ালী ব্যানার্জি সরকার, মধুছন্দা সরকার-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
 
 হাড়োয়ার ৯১ বছরের রবীন সংঘ পাঠাগারের দুর্গাপুজো
 
এবারের ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’ থিম সেই ধারাবাহিকতায় নতুন পালক যোগ করেছে এই পুজোকমিটি। তারা দেখিয়েছেন, সীমিত পরিসরের মধ্যেও সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য আর সামাজিক বার্তার সমন্বয়ে তৈরি করা যায় ব্যতিক্রমী আয়োজন। প্রকৃতিকে বাঁচানোর শপথের পাশাপাশি সামাজিক বিভেদ ভুলে একসঙ্গে চলার অঙ্গীকারের পাঠ যেন দিয়ে দিল রবীন সংঘ পাঠাগার।


শেহতীয়া খবৰ