সংহতি শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির ছবি বক্সনগরে, ২১ বছর ধরে একসঙ্গে পুজোর আয়োজন হিন্দু-মুসলিমদের

Story by  Nurul Haque | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
সংহতি শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির ছবি বক্সনগরে, ২১ বছর ধরে একসঙ্গে পুজোর আয়োজন হিন্দু-মুসলিমদের
সংহতি শারদীয় দুর্গোৎসবে সম্প্রীতির ছবি বক্সনগরে, ২১ বছর ধরে একসঙ্গে পুজোর আয়োজন হিন্দু-মুসলিমদের
 
নূরুল হক / আগরতলা

ধর্ম আলাদা, কিন্তু উৎসবের আনন্দ এক। বিশ্বাসের পথ ভিন্ন হলেও সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ। সেই বার্তাই যেন আরও একবার তুলে ধরল সোনামুড়া মহকুমার সীমান্তবর্তী বক্সনগরের কুলুবাড়ী এলাকার সংহতি শারদীয় দুর্গোৎসব। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন। জাতি-ধর্মের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে উৎসব পালনের এই ঐতিহ্য আজ এলাকার মানুষের কাছে সম্প্রীতির এক পরিচিত ছবি।
 
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে যখন চারদিকে উৎসবের আমেজ, তখন কুলুবাড়ীর এই পুজোমণ্ডপে ধরা পড়ছে সম্প্রীতির এক অন্যরকম দৃশ্য। পুজোর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা, চাঁদা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন আয়োজন, সব ক্ষেত্রেই হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এখানে দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক বন্ধন ও সহাবস্থানেরও প্রতীক।
 
কুলুবাড়ীর পুজোমণ্ডপে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের এক দৃশ্য
 
পুজো উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২১ বছর ধরে এইভাবেই গ্রামের দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে দুর্গোৎসবের আয়োজন করে আসছেন। গ্রামের অধিকাংশ পরিবার মুসলিম সম্প্রদায়ের হলেও দুর্গাপুজোকে ঘিরে কোথাও বিভেদের ছবি নেই। বরং একে অপরের উৎসবে শামিল হওয়া এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
 
এলাকার বাসিন্দা নুর আলম জানান, গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পরিবার রয়েছে। বাকি অধিকাংশ পরিবার মুসলিম সম্প্রদায়ের। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় কখনও তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। দুর্গাপুজোয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন সহযোগিতা করেন এবং আনন্দে সামিল হন, তেমনই ঈদের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও তাঁদের আনন্দের অংশীদার হন। তাঁর কথায়, ধর্ম আলাদা হলেও গ্রামের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রয়েছে।
 
বক্সনগর পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারপারসনও এই ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন, এলাকার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও পুজো আয়োজনে তাঁদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আগামী প্রজন্মও যেন এই সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
 
কুলুবাড়ীর পুজোমণ্ডপে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের এক দৃশ্য
 
বর্তমান সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব নিয়ে যখন নানা আলোচনা হয়, তখন বক্সনগরের কুলুবাড়ীর এই দুর্গোৎসব তুলে ধরছে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের বাস্তব চিত্র। এখানে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে। এক সম্প্রদায়ের উৎসব অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও হয়ে উঠছে আনন্দের উপলক্ষ।
 
সব মিলিয়ে, বক্সনগরের কুলুবাড়ী এলাকার সংহতি শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু ২১ বছরের একটি ঐতিহ্য নয়, বরং সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য সামাজিক দৃষ্টান্ত। মণ্ডপের আলো, ঢাকের শব্দ আর উৎসবের আনন্দের মধ্য দিয়ে এই পুজো যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই সামাজিক বন্ধনের আসল শক্তি। আগামী দিনেও এই সম্প্রীতির ধারা অটুট থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা এলাকার বাসিন্দাদের।


শেহতীয়া খবৰ