দাদার স্মৃতিতে ভারত, কাশ্মীরের ছবি আর এক বোনের না-পাওয়ার বেদনা, অ্যান কারসনের ‘নক্স’

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
দাদার স্মৃতিতে ভারত, কাশ্মীরের ছবি আর এক বোনের না-পাওয়ার বেদনা, অ্যান কারসনের ‘নক্স’
দাদার স্মৃতিতে ভারত, কাশ্মীরের ছবি আর এক বোনের না-পাওয়ার বেদনা, অ্যান কারসনের ‘নক্স’
 
কানাডা

কিছু স্মৃতি কখনও নিজের চোখে দেখা হয় না, তবু তা মনের গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে। অন্যের চোখ দিয়ে দেখা কোনও দেশ, কিছু চিঠি, কবিতা আর ছবি, এভাবেই এক সাহিত্যিকের সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে দূরদেশের ইতিহাস। কানাডীয় কবি ও লেখক অ্যান কারসনের সাহিত্যজগতে ভারতের উপস্থিতি অনেকটা এমনই। দাদা মাইকেল কারসনের পাঠানো চিঠি ও ছবির সূত্র ধরে ভারত, বিশেষত কাশ্মীর, তাঁর স্মৃতির জগতে জায়গা করে নেয়। সেই স্মৃতি পরবর্তীকালে রূপ পায় শোকগাথা ‘নক্স’-এ।

অ্যানের সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত অনুভূতি, বিচ্ছেদ এবং শোকের প্রকাশ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর লেখার ধরনও প্রচলিত কবিতা বা গদ্যের ছকের বাইরে। আর দাদা মাইকেলকে হারানোর অভিজ্ঞতা যেন সেই ব্যক্তিগত বেদনাকে আরও গভীর মাত্রা দিয়েছিল। মাইকেলের জীবনযাত্রা, তাঁর পাঠানো চিঠি, আঁকা ছবি এবং কবিতার মধ্য দিয়ে অ্যানের কাছে ধরা দিয়েছিল এক অচেনা ভারত।
 
দাদার চিঠিতে ধরা পড়েছিল কাশ্মীর
 
আশির দশকে মাদক-সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার পর মাইকেল কানাডা ছেড়ে ভারতে চলে আসেন বলে এই কাহিনিতে উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। সেই সময় বোনের কাছে পাঠানো ছোট ছোট চিঠিতে জায়গা করে নিত কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কবিতা এবং তাঁর নিজের আঁকা ছবি।
 
অ্যানের কাছে এই চিঠিগুলি ছিল শুধু পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, দাদার জীবনের এক অজানা অধ্যায়ের জানালা। দাদা যে দেশ দেখেছেন, যে ভূখণ্ডের সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে, সেই দেশকে অ্যানও চিনতে শুরু করেন তাঁর পাঠানো স্মৃতির মধ্য দিয়ে। ফলে ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয় প্রত্যক্ষ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নয়, বরং এক গভীর ব্যক্তিগত বন্ধনের সূত্রে।
 
শেষ দেখা আর হল না
 
মাইকেলের জীবনের শেষ অধ্যায়ও অ্যানের কাছে এক বেদনাময় স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়। পরে মাইকেল ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে বসবাস শুরু করেন। ২০০০ সালে মৃত্যুর আগে তিনি বোনকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসার জন্য ডেকেছিলেন। কিন্তু অ্যানের সেখানে যাওয়ার নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই আসে দাদার মৃত্যুসংবাদ।
 
শেষবারের মতো দাদার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আর হয়নি। এই অসমাপ্ত বিদায়, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং স্মৃতির ভার অ্যানের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। দাদার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ না হওয়ার আক্ষেপই যেন তাঁর শোকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনিবার্য অধ্যায়।
 
শোক থেকে জন্ম ‘নক্স’
 
মাইকেলের মৃত্যুর পর অ্যান লেখেন ‘নক্স’। লাতিন শব্দ ‘Nox’-এর অর্থ রাত। বইটি শুধু মৃত দাদার উদ্দেশে লেখা একটি শোকগাথা নয়; এর মধ্যে রয়েছে স্মৃতি ধরে রাখার এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস। মাইকেলের চিঠি, কবিতা এবং আঁকা ছবির মতো উপাদানও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে বইটি একই সঙ্গে সাহিত্য, পারিবারিক স্মৃতির দলিল এবং হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের জীবনকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
 
এখানে ভারত ও কাশ্মীরের উপস্থিতিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যানের কাছে এই ভূখণ্ডের স্মৃতি দাদার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁর চোখে দেখা কাশ্মীরের ছবি এবং তাঁর পাঠানো লেখার মধ্য দিয়ে ভারত হয়ে ওঠে এক ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ, যেখানে ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সম্পর্কের টান।
 
অ্যান কারসনের সাহিত্যকীর্তির দিকে তাকালে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত শোকও কীভাবে শিল্পের ভাষা পেতে পারে। দাদাকে হারানোর যন্ত্রণা তিনি মুছে ফেলতে পারেননি; বরং সেই বেদনাকেই রূপ দিয়েছেন সৃষ্টিতে। আর সেই সৃষ্টির পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে এমন এক ভারতের স্মৃতি, যা অ্যান নিজে হয়তো দাদার মতো করে দেখেননি, কিন্তু অনুভব করেছেন তাঁর পাঠানো চিঠি ও ছবির মধ্য দিয়ে।
 
একজন মানুষের অনুপস্থিতি, কয়েকটি চিঠি আর দূরদেশের কিছু ছবি, এই সামান্য উপাদান থেকেই তৈরি হতে পারে গভীর সাহিত্য। অ্যান কারসনের ‘নক্স’ সেই ব্যক্তিগত শোককে ভাষা দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।


শেহতীয়া খবৰ