এ যেন মহাভারতের LIVE যুদ্ধ! চক্রব্যূহের ফাঁদে ঢুকলে বেরোবেন কীভাবে? দুর্গাপুজোতে হাবড়ায় নজরকাড়া চমক, ছবি ভাইরাল নেটদুনিয়ায়
তরুণ নন্দী / কলকাতা
হাবড়ায় এই পুজোমণ্ডপে ঢুকলেই থিমের হাত ধরে ঘুরে আসা যাবে ইতিহাসের অলিগলি থেকে। পুরাণের বিস্ময়কর জগতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে এই থিম। এবারের ভাবনা এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার প্রফুল্লনগর আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সমবায় উপনিবেশ লিমিটেডের দুর্গাপুজোকে। মণ্ডপে পা রাখলেই যেন খুলে যাচ্ছে মহাভারতের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। সামনে সাত স্তরের রহস্যময় গোলকধাঁধা, চারপাশে যুদ্ধের সাজ, রথ, হাতি, তীর-ধনুক আর মাঝখানে বীর অভিমন্যুর অসম লড়াই।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সমবায় উপনিবেশ লিমিটেড-এর পুজোয় এবারের থিম ‘চক্রব্যূহ’। পুজোর ৭৬তম বর্ষে এমনই অভিনব ভাবনায় এই পুজো দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। মণ্ডপের নানা মুহুর্তের ছবি ভাইরাল হতেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে নেটদুনিয়ায় চর্চা।
মহাভারতের এই অধ্যায়ের কাহিনি কমবেশি সকলেরই জানা। কিন্তু সেই মহাকাব্য থেকে উঠে আসা যুদ্ধকৌশল, বীরত্ব আর রহস্যকে যদি চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলা হয়, তা হলে অভিজ্ঞতাটা অন্য রকম হবেই। হাবড়ার প্রফুল্লনগরের এই পুজোর থিম ঠিক সেই কাজটাই করেছে। মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকেই শুরু হচ্ছে চক্রব্যূহের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্ব। একের পর এক স্তর পেরিয়ে এগোতে হবে দর্শনার্থীদের। রহস্যের অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়ে যেন তৈরি হচ্ছে এক রহস্যময় অনুভূতি। মনে হয়, যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের কঠিন পরীক্ষায় সামিল হয়েছেন দর্শনার্থীরা।
চক্রব্যূহের সাতটি স্তরকে ঘিরে রয়েছে মহাভারতের যুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ। কৌরব ও পাণ্ডব সেনার আদলে তৈরি বিভিন্ন মডেল, রথ, হাতি, তীর-ধনুক আর যুদ্ধের দৃশ্যের প্রতিরূপ যেন মণ্ডপের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি স্তর পেরোতেই যেন যুদ্ধের এক একটি অধ্যায়ের কথা স্মরণে আসছে দর্শনার্থীদের। আলোকসজ্জা ও থিম মিউজিকের ব্যবহারে সেই আবহ আরও জীবন্ত হয়ে ওঠেছে এই মণ্ডপের অন্দরমহলে।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সমবায় উপনিবেশ লিমিটেড-এর পুজোয় ‘চক্রব্যূহ’ থিম
এখানে দর্শনার্থীরা ঢুকলেই মহাভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতিও টের পাবেন। আর এই অভিজ্ঞতাই চক্রব্যূহ থিমকে অন্য পুজোর ভিড়ে আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছে। এই মণ্ডপের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই বীর অভিমন্যু। মহাভারতের সেই যোদ্ধা, যিনি চক্রব্যূহে প্রবেশের কৌশল জানলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্পূর্ণ পদ্ধতি জানতেন না। তবুও যুদ্ধক্ষেত্রে পিছিয়ে না এসে তিনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন প্রবল সাহসের সঙ্গে।
বীর অভিমন্যুর সেই বীরত্বগাথাকেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। একদিকে কৌরবপক্ষের শক্তিশালী যোদ্ধারা, অন্যদিকে একা অভিমন্যু। অসম শক্তির এই লড়াই আসলে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক, এটাই এই থিমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে শিল্পী। থিম শিল্পীর শিল্পভাবনায় উঠে আসা প্রতিটি স্তর পেরোলেই মহাভারতের গল্প যাঁরা জানেন, তাঁদের কাছে স্মৃতির সেই দরজা খুলে যাবে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে মহাকাব্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে দৃশ্যের মাধ্যমে চিনে নেওয়ার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সমবায় উপনিবেশ লিমিটেড-এর পুজোয় ‘চক্রব্যূহ’ থিম
কেন এত চর্চায় এই চক্রব্যূহ? কারণ, এই ভাবনা মানুষকে মণ্ডপের ভিতরে টেনে নিয়ে যাবে আর বেরিয়ে আসার পরও মনে থেকে যাবে। হাবড়ার এই পুজোর চক্রব্যূহ থিমে রয়েছে সেই সম্ভাবনা। আসলে এখানে এলে বোঝা যাবে, মণ্ডপের গোলকধাঁধার মতো বিন্যাসের শৈল্পশৈলী। অভিমন্যুর বীরত্বকে কেন্দ্র করে গোটা আয়োজনের আবেগ তৈরির পাশাপাশি দুরন্ত আলোকসজ্জা ও আবহসংগীতের সাহায্যে যুদ্ধক্ষেত্রের অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
মণ্ডপের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই এই পুজোকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কৌতূহল বেড়েছে কয়েকগুণ। দুর্গাপুজোয় থিমের সৌজন্যে মহাভারতের মতো মহাকাব্যকে নতুন করে মনে করার সুযোগও তৈরি করেছে এই পুজোকমিটি। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে যদি চক্রব্যূহের একেকটি স্তর পেরোতে পেরোতে অভিমন্যুর বীরত্বের কাহিনি মনে পড়ে যায়, তা হলে মণ্ডপ দর্শনই হয়ে উঠতে পারে পুরাণের এক অভিনব পাঠ। আর সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলে অবশ্যই ঘুরে আসতে হবে হাবড়ার প্রফুল্লনগরের এই পুজোমণ্ডপে।