কলকাতা:
রাম মন্দিরের প্রতিরূপ থেকে শুরু করে ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন, এমনকী বিশালাকার ‘ভারতমাতা’র মূর্তি—এ বছর কলকাতার একাধিক দুর্গাপুজো মণ্ডপে উঠে এসেছে ভারতের সভ্যতাগত ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক পরম্পরা ও জাতীয়তাবাদের নানা দিক। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এ বছরের পুজোয় এই বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে।শনিবার মহাসপ্তমীতে পুজো মণ্ডপগুলিতে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতেই দেশের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঘিরে বিভিন্ন পুজো কমিটির ভাবনা নজর কেড়েছে।
মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কে ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন এ বছর তৈরি করেছে রাম মন্দিরের আদলে এক দর্শনীয় মণ্ডপ। রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনা ও শিল্পসমৃদ্ধ নকশার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মন্দিরের স্থাপত্যের জাঁকজমক।পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র কুমার শর্মা বলেন, “দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যবাহী রূপ অক্ষুণ্ণ রেখে ভারতের স্থাপত্য ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক পরম্পরাকে সামনে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য।”শিল্পী চিরঞ্জীবের তত্ত্বাবধানে তৈরি এই মণ্ডপে মূলত প্লাইউড ও বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে স্থান পেয়েছে রামায়ণের দৃশ্য এবং ভগবান রামের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি।
শর্মা জানান, শিল্পী কুশ বেরার তৈরি দুর্গাপ্রতিমায় ব্যবহার করা হয়েছে পাথরের মতো রং ও মার্বেলের মতো মসৃণ আবরণ। প্রাচীন মন্দিরের ভাস্কর্যের আদলে তৈরি এই প্রতিমা বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।অন্যদিকে, প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে এ বার পুজোর মূল ভাবনা দেশাত্মবোধ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ‘সনাতনী চেতনায় বন্দে মাতরম’ থিমে আয়োজিত এই পুজোয় জাতীয় সংগীত নয়, জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পুজো কমিটির সভাপতি তথা বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ জানান, এ বছর পুজোর ৯১তম বর্ষ। ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘বন্দে মাতরম’-এর দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বিশেষ আয়োজন।তিনি বলেন, “এই মণ্ডপে ভারতের মানচিত্র ও লালকেল্লার আদলে বিভিন্ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। হাজার হাজার আলোয় সেগুলিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।”
শিল্পসম্মত ইনস্টলেশনের পাশাপাশি রয়েছে আলো ও শব্দের বিশেষ প্রদর্শনী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলি তুলে ধরা হয়েছে সেখানে। দেশভাগের ঘটনাও স্থান পেয়েছে এই উপস্থাপনায়। পাশাপাশি রয়েছে ট্রেনের প্রতিরূপ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু ও মাতঙ্গিনী হাজরার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।
তবে দেশাত্মবোধের বিস্তৃত উপস্থাপনার মধ্যেও দুর্গাপ্রতিমার চিরাচরিত রূপ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে বলে জানান সজল ঘোষ।দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরে সুরুচি সংঘ আবার অন্য পথে হেঁটেছে। গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও লোকজ শিল্পকে তুলে ধরার পাশাপাশি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতেও শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে এ বছরের পুজোয়।
পুজো কমিটির সম্পাদক তথা বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার জানান, ‘উৎস’ থিমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রামবাংলার শান্ত পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং দেশজ শিল্পকলার নানা দিক।তিনি বলেন, “বাঁশ ও খড়ের মতো উপকরণ ব্যবহার করে গ্রামীণ জীবনের সরলতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলার গ্রামাঞ্চলের সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার ঐতিহ্যকেও সামনে আনা হয়েছে।”
অন্যদিকে, কলকাতার উত্তর প্রান্তে সোদপুরের এইচবি টাউনে বিজয়পুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির এ বছরের থিম ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’। পুজো মণ্ডপের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বিশালাকার ভারতমাতার মূর্তি।শিল্পী পার্থ মাইতির তৈরি ৩৫ ফুট উঁচু ভারতমাতার মূর্তিটি মণ্ডপের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করা হয়েছে।
পুজো কমিটির এক মুখপাত্র বলেন, “এ বছরের পুজোর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দেশপ্রেমের আবেগ জাগিয়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”তিনি আরও জানান, মূর্তিটি বৈষ্ণোদেবী মন্দিরের দেবীমূর্তির আদলে তৈরি করা হয়েছে।