অটোরিকশায় জল-বিস্কুট, সঙ্গে প্রাণীদের ওষুধ, মুম্বাইয়ের হাবিব যেন মানবিকতার ফেরিওয়ালা
ভক্তি চালক
মুম্বাইয়ের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলেন নিজের গন্তব্যের দিকে। সেই ব্যস্ততার মাঝেই অটোরিকশা চালক হাবিব শেখ তৈরি করেছেন এক অন্যরকম মানবিকতার নজির। তাঁর অটোরিকশায় উঠলেই যাত্রীরা পান বিনামূল্যে ঠান্ডা জল ও বিস্কুট। শুধু মানুষই নন, অসুস্থ ও আহত প্রাণীদের জন্যও তাঁর অটোরিকশা হয়ে উঠেছে এক চলমান আশ্রয়। সেখানে থাকে প্রাণীদের খাবার ও ওষুধও।
হাবিব তাঁর জীবনের গল্প জানিয়েছেন ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-কে। একসময় ইমিটেশন জুয়েলারির ব্যবসা করতেন হাবিব। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় সেই ব্যবসা কার্যত ভেঙে পড়ে। আর্থিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। বাধ্য হয়ে বোতলজাত পানীয় জল বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু টানা চার দিন সাইকেলে করে রাস্তায় রাস্তায় জল নিয়ে ঘুরেও একটি বোতল পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেননি।
এক সন্ধ্যায় একটি গাড়ির নীচ থেকে অন্ধকারে একটি বিড়ালছানার কান্নার শব্দ শুনতে পান হাবিব। আশপাশে তার মায়ের কোনও সন্ধান ছিল না। রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির চাকায় বিড়ালছানাটি চাপা পড়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় হাবিব সেটিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
ক্ষুধার্ত বিড়ালছানাটিকে ভালোবেসে দুধ খাওয়ান তিনি। পেট ভরে যাওয়ার পর সেটি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন সকালে জল বিক্রি করতে বাড়ি থেকে বের হন হাবিব। দুপুরের মধ্যেই তিনি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ২০টি বাক্সের সবকটি বিক্রি করে ফেলেন।
হাবিব বলেন, “চার দিন ধরে ঘুরেও একজন ক্রেতা পাইনি। আর সেদিন দুপুরের মধ্যেই ২০টি বাক্স বিক্রি হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, এটা ওই বিড়ালছানাটির দোয়া।” ধীরে ধীরে তাঁর জলের ব্যবসা স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। কাজ আরও বাড়ানোর জন্য একটি অ্যাক্টিভা স্কুটার কেনেন তিনি। পরে একটি চার চাকার টেম্পো কেনার কথাও ভাবেন। কিন্তু তার দাম তাঁর নাগালের বাইরে ছিল।
শেষ পর্যন্ত তিনি একটি অটোরিকশা কেনেন। বোতলজাত জল সরবরাহের কাজে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত। ফলে তাঁর হাতে অটোরিকশা এবং যথেষ্ট অবসর সময়, দুটিই থেকে যায়।
একদিন একটি মলের বাইরে অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন হাবিব। সেই সময় এক মহিলা তাঁর কাছে এসে অটোরিকশায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গে তখনও তিনি ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন না। তাই প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় পড়েন। কিন্তু মহিলাটি অত্যন্ত প্রয়োজনের তাগিদে বারবার সাহায্যের অনুরোধ করায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যান হাবিব। সেই মহিলা তাঁকে মিটার পড়া এবং ম্যাপ দেখে রাস্তা খুঁজে নেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দেন।
ভাড়া হয়েছিল ৪০ টাকা। কিন্তু প্রথম দিন তাঁকে সাহায্য করার জন্য কৃতজ্ঞতা হিসেবে ওই মহিলা ১০০ টাকা দেন। সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে হাবিব বলেন, “ওই ম্যাডাম দেওয়া ১০০ টাকা পকেটে রাখার আগেই আরেকজন যাত্রী চলে এলেন। সেদিন থেকেই আমি শপথ করেছিলাম, রাস্তায় কোনও প্রাণী, পাখি বা অসহায় মানুষকে দেখলে আমি সবসময় তাদের সাহায্যের জন্য ছুটে যাব।” সেই প্রতিজ্ঞাই ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
হাবিবের অটোরিকশায় ওঠা যাত্রীদের বিনামূল্যে ঠান্ডা জল ও বিস্কুট দেওয়া হয়। অটোরিকশার পিছনে রয়েছে একটি বড় তেরঙা পতাকা। পাশাপাশি রাখা রয়েছে টবের গাছ, যা অটোরিকশাটিকে দিয়েছে সবুজের ছোঁয়া। অন্য অটোচালকরা যেসব যাত্রীকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন, তাঁদেরও হাবিব গন্তব্যে পৌঁছে দেন। ভাড়া মাত্র ২৫ বা ৩০ টাকা হলেও তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।
দৃষ্টিহীন মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, কোলে শিশু থাকা মায়েরা এবং হাসপাতালে যাতায়াতকারী প্রবীণ রোগীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে এগিয়ে আসেন হাবিব। তাঁর এই কাজ দেখে অনেক কৃতজ্ঞ যাত্রী আর্থিক সাহায্যও করেন। সেই অর্থ দিয়ে তিনি অটোরিকশার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনেন এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।
প্রাণীদের প্রতি হাবিবের ভালোবাসা
হাবিবের মানবিকতার পরিধি মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অটোরিকশায় সবসময় মজুত থাকে বিড়াল ও কুকুরের খাবার এবং আহত ও অসুস্থ প্রাণীদের জন্য ওষুধ। গভীর রাতেও কোনও কুকুর বা বিড়াল দুর্ঘটনার শিকার হলে নিজের খরচে তিনি তাদের পশু চিকিৎসালয়ে নিয়ে যান। হাবিবের এই নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে এক মহিলা চিকিৎসক তাঁর নিয়ে যাওয়া প্রাণীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করতে শুরু করেন।
কেন তিনি প্রাণীদের সাহায্য করেন, তা ব্যাখ্যা করে হাবিব বলেন, “কোনও মানুষ যন্ত্রণায় থাকলে রাত ১টাতেও হাসপাতালে ছুটে যেতে পারে। কিন্তু এই নির্বাক প্রাণীদের কী হবে? তারা শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, এই আশায় যে কেউ হয়তো তাদের একটি বিস্কুট বা একটু দুধ দেবে। এই নির্বাক প্রাণীদের সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য।”
অভিনেত্রী আদাহ শর্মার সঙ্গে অটোরিকশা চালক হাবিব শেখ
বলিউডেও পৌঁছেছে হাবিবের মানবিকতার গল্প
হাবিবের অভিনব অটোরিকশা এবং তাঁর মানবিক কাজের কথা মুম্বাইয়ের রাস্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, পৌঁছে গিয়েছে বলিউডেও। অভিনেত্রী আদাহ শর্মা এবং ‘তারক মেহতা কা উলটা চশমা’-র পরিচিত চরিত্র রিটা রিপোর্টারের অভিনেত্রী প্রিয়া আহুজা তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, যাঁরা হাবিবের অটোরিকশায় যাতায়াত করেছেন এবং তাঁকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করেছেন।
অনেক যাত্রীও নিয়মিত হাবিবের ভিডিও রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। বিনামূল্যে জল-বিস্কুট দেওয়ার এই সহজ উদ্যোগ এবং প্রাণীদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁকে মুম্বাইয়ের রাস্তায় পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ করে তুলেছে।
অনাথ নাসিরকেও দিয়েছিলেন আশ্রয়
হাবিবের সমাজসেবার পরিধি প্রাণীদের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। নাসির নামে এক অনাথ কিশোরকেও তিনি সাহায্য করেছেন। বাবাকে হারানোর পর একটি গ্রাম থেকে মুম্বাইয়ে এসেছিল নাসির। খারাপ সঙ্গের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল তার। হাবিব তাঁকে থাকার জায়গা দেন, সকালের খাবার ও অন্যান্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য কাজের বিনিময়ে তাঁকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে দিতে শুরু করেন।
নাসিরের প্রসঙ্গে হাবিব বলেন, “আমি কাউকে খাওয়ানোর মতো মহান কেউ নই; এই সবকিছু করার শক্তি আল্লাহই দেন। আমি শুধু একটি মাধ্যম (জরিয়া)। যার মাথার ওপর বাবার হাত নেই, এমন একটি ছেলের মাথায় হাত রাখা অত্যন্ত পুণ্যের (সওয়াবের) কাজ।”
প্রাণীদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবার স্বপ্ন
নিজের জন্য বড় কোনও ব্যবসা গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই হাবিবের। তাঁর স্বপ্ন একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র এবং আহত প্রাণীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার একটি চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৫ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় একটি জায়গা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। সেখানে চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তারও নিয়োগ করতে চান তিনি।
মুম্বাইয়ের মতো ব্যস্ত শহরে যেখানে অনেকেরই একে অপরের দিকে তাকানোর সময়টুকুও থাকে না, সেখানে হাবিব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজের গতি কিছুটা থামিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাছে এই কাজের পুরস্কার কোনও আর্থিক লাভ নয়। হাবিবের বিশ্বাস, “অন্যকে সাহায্য করে যে দোয়া পাওয়া যায়, সেটাই আমার আসল উপার্জন।”