নাসিম / হায়দ্রাবাদ
যখনই হায়দ্রাবাদ–এর নাম উচ্চারিত হয়, জিভে যেন হালিমের স্বাদ এসে পড়ে। ঘি-তে ধীরে সেদ্ধ হওয়া গম ও খাসির মাংসের এই পদ শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও মোহনীয় করে তোলে।এই খাবার সাধারণ মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে। সন্ধ্যা নামলেই যখন রোজাদাররা ইফতার করেন, তখন হায়দ্রাবাদের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে ধীরে রান্না হওয়া হালিমের মাদকতাময় সুবাস।
দাক্ষিণাত্যের অসংখ্য স্বাদের ভিড়ে হায়দ্রাবাদি হালিম সময়, ঐতিহ্য ও ভূগোলের সব সীমানা পেরিয়ে এক বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। একসময় এটি কেবল রাজকীয় রান্নাঘরে তৈরি হতো; আজ সব শ্রেণির মানুষই সমান তৃপ্তির সঙ্গে উপভোগ করেন। এটি শুধু খাবার নয়, সামরিক রান্নাঘরের স্মৃতি ও রমজানের আবেগময় অনুষঙ্গ।
যদিও সারা বছর হালিম মেলে, রমজানে এর তাৎপর্য বহুগুণ বেড়ে যায়। গমের দীর্ঘস্থায়ী শক্তি এবং মাংসের প্রোটিন, দুটিই মিলে এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। হায়দ্রাবাদের রমজান হালিম ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ, শতাব্দী ধরে এটি উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়।
হালিমের উৎস আরব বিশ্বের হরীস নামক খাবারে। এটি প্রথম পৌঁছায় মিশর–এ ইরানি ও আফগান ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। মুঘল আমলে এটি ইরান ও আফগানিস্তান হয়ে হায়দ্রাবাদ–এ পৌঁছায় আরব বণিকদের মাধ্যমে। ভারতে এটি আসে হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিযাম মেহবুব আলি খান–এর শাসনামলে। আর সপ্তম নিযাম মীর উসমান আলি খান–এর আমলে এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
এই খাবার সামরিক পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছিল, যার ফলে রেসিপিতে আরও শৈল্পিকতা যোগ হয়। আরবীয় ও স্থানীয় স্বাদের মেলবন্ধন একে রাজকীয় রান্নাঘরের মণিমুক্তা বানায় এবং পরে সাধারণের খাবারেও পরিণত হয়। হালিম রান্না করতে লাগে ধৈর্য ও দক্ষতা। এটি সাধারণ খাবারের মত দ্রুত রান্না হয় না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাড়তে ও ঢিমে আঁচে রাখতে হয়।
হালিম তৈরিতে অন্তত ২১টি উপকরণ লাগে, লাল মরিচ গুঁড়ো, লবঙ্গ, শাহী জিরা, গোলমরিচ, গম, বাসমতি চাল, বিভিন্ন ডাল (মুগ, মসুর, মাশ), আদা, রসুন, খাঁটি ঘি, কাজু, বাদাম এবং ভাজা পেঁয়াজ। শুরুতে এটি ছিল গম, গো মাংস, ঘি ও শুকনো ডাল দিয়ে তৈরি সহজ খাবার। কিন্তু দাক্ষিণাত্যের মাটিতে এসে স্থানীয় মসলার সুবাস ও ধীর রান্নার পদ্ধতিতে এটি নতুন রূপ পায়। মাংস, গম ও মসলা এতটাই একীভূত হয় যে মাংস আলাদা করে বোঝা যায় না, তন্তু হয়ে পুরো মিশ্রণে মিশে যায়। জাফরান, দারচিনি ও দেশি ঘি এর স্বাদে আরও সমৃদ্ধি আনে।
আজও কিছু স্থানে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে হালিম রান্না করা হয়, প্রাচীন স্বাদ অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে। হালিমকে জিআই ট্যাগ দেওয়ার অর্থ, হায়দ্রাবাদি হালিম কেবল হায়দ্রাবাদ–এ প্রস্তুত করা সম্ভব, বাইরে এর আসল রূপ আইনগতভাবে বানানো যায় না। ২০১০ সালে জিআই ট্যাগ পায় হালিম, যা সম্ভব হয় হালিম মেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় ৬০০০ সদস্যের প্রচেষ্টায়।
২০১৯ সালে এটি দ্বিতীয়বারের মতো নবায়ন হয় এবং ২০২২ সালে ‘মোস্ট পপুলার জিআই’ খেতাব পায়, যেখানে রসগোল্লা, বিকানেরি ভুজিয়া ও রতলামী সেভের মতো জনপ্রিয় আঞ্চলিক পদ ছিল। হালিম এখন শুধু খাবার নয়, এটি হায়দ্রাবাদের একটি বিশাল শিল্প।
প্রতীকী ছবি
গত বছর হালিম ব্যবসার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা; চলতি রমজানে তা ১০০০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত মৌসুমে প্রায় ৫০ লক্ষ প্লেট হালিম বিক্রি হয়েছিল; এবার তা ৬০ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে ধারণা। শহরে প্রায় ৬০০০ কেন্দ্রে হালিম বিক্রি হয় এবং বড় হোটেলে প্রতিদিন ২৫,০০০ কেজি পর্যন্ত হালিম রান্না করা হয়।
প্রতি মৌসুমে প্রায় এক লক্ষ মানুষ হালিম শিল্পে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।হায়দ্রাবাদি হালিমের চাহিদা শুধু দেশেই নয়, আমেরিকা, ব্রিটেন ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও পৌঁছে গেছে।