প্রযুক্তি ও ইসলামিক মূল্যবোধের সমন্বয়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 12 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
ইমান সাকিনা

প্রত্যেক যুগেই মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছে তার হাতে থাকা উপকরণ আর অর্জিত সামর্থ্যের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবীতে সেই পরীক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এগুলো আমাদের চিন্তার ধরণ, কথাবার্তা, সম্পর্ক গড়ে তোলা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের পথচলাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। মতামত, আচরণ, অভ্যাস ও বিশ্বাস, সবই এখন এই প্রযুক্তির স্পর্শে রূপান্তরিত হয়। তাই মুসলমানদের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত কি না, তা নয়; বরং ইসলামের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার আলোকে প্রযুক্তিকে কীভাবে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
 
একজন মুমিনের উচিত, তাঁর অনলাইন উপস্থিতিও যেন তাঁর ঈমান ও তাকওয়ার প্রতিফলন ঘটায়। তাকওয়া নিয়ে ব্যবহার করা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিয়ামতের দিনে অনুশোচনার কারণ নয়, বরং সওয়াবের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
 

ইসলাম এক চিরকালীন জীবনব্যবস্থা। এর নীতিমালা কোনো নির্দিষ্ট শতক বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই আগের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকলেও কোরআন ও সুন্নাহ এই ডিজিটাল দুনিয়াকে নৈতিকভাবে পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
 
প্রযুক্তি-একটি আমানত

ইসলাম শেখায়, মানুষকে প্রদত্ত প্রতিটি জিনিসই আল্লাহর আমানত। আমাদের সময়, বুদ্ধিবৃত্তি, বাকশক্তি ও সম্পদ, সবই আমাদের হাতে অর্পিত, যার জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। প্রযুক্তিও এই আমানতের অংশ। আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি তথ্য, যোগাযোগ, ছবি ও প্রভাবের এক বিশাল দ্বার। আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করি, তা আমাদের তাকওয়ারই প্রকাশ। একজন মুসলমান যখন সামাজিক মাধ্যমে লগ ইন করেন, তখনও তাঁর ওপর ঠিক সেই নৈতিক দায়িত্বই বর্তায়, যেটুকু বাস্তবে কথা বলার সময় থাকে।
 
আল্লাহ বলেন, “মানুষ কোনো কথা উচ্চারণ করে না, কিন্তু তার কাছে সদা প্রস্তুত একজন পর্যবেক্ষক তা লিপিবদ্ধ করে।” (কোরআন ৫০:১৮) এই আয়াত শুধু মুখে বলা কথার জন্য নয়, টাইপ করা, পোস্ট করা, মন্তব্য করা প্রতিটি শব্দের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
 
ডিজিটাল যুগে সংযম বজায় রাখা
 
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, নতুবা নীরব থাকে।” (বুখারি ও মুসলিম)
 
আজ ‘কথা বলা’ মানে শুধু উচ্চারণ নয়, পোস্ট করা, শেয়ার করা, ফরওয়ার্ড করা, মন্তব্য করা, এসবই এর অন্তর্ভুক্ত। তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়া জানানো, গুজব ছড়ানো, অকারণ তর্কে জড়ানো, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও কটূক্তি, এসব অনলাইনে সহজেই ঘটে যায়।
 
ইসলাম যোগাযোগে সংযম, প্রজ্ঞা ও মর্যাদার শিক্ষা দেয়। গীবত, অপবাদ, সন্দেহ এবং অযথা অনুসন্ধান কোরআনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ (৪৯:১২)। অথচ অনলাইনে এগুলো করা প্রায়ই মাত্র এক ক্লিকের ব্যাপার!
 
প্রতীকী ছবি
 
বিনয় ও গোপনীয়তার সংরক্ষণ
 
ইসলাম বিনয়কে অত্যন্ত মূল্যবান গুণ হিসেবে তুলে ধরে, অথচ সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় এর বিপরীত আচরণকে উৎসাহ দেয়,নিজেকে প্রদর্শন করা, ব্যক্তিগত জীবন অতিরিক্ত প্রকাশ করা, অচেনা মানুষের সামনে গোপনীয়তা উন্মুক্ত করা ইত্যাদি।
 
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “প্রত্যেক ধর্মের একটি বৈশিষ্ট্য থাকে, আর ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো, হায়া (বিনয়)।” (ইবনে মাজাহ)
 
অতিরিক্ত ছবি শেয়ার করা, ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ করা বা লাইক–কমেন্টের মাধ্যমে স্বীকৃতি খোঁজা নীরবে বিনয়কে ক্ষয় করে।
 
সময় ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতা
 
সামাজিক মাধ্যমের অন্যতম বড় ক্ষতি হলো সময় নষ্ট। উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রাস করে নিতে পারে।
 
রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন, “দুটি নিয়ামত আছে, অনেক মানুষ যার মূল্যায়ন করে না, স্বাস্থ্য ও অবসর সময়।” (বুখারি)
 
ইসলাম উদ্দেশ্যমূলক জীবন যাপনের নির্দেশ দেয়। একজন মুমিনের সময় অত্যন্ত মূল্যবান, যা ইবাদত, শিক্ষা, পরিবার, কাজ এবং বিশ্রামে ব্যবহার করা উচিত। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার এসব দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
 
জ্ঞান অনুসন্ধান ও কল্যাণ ছড়ানো
 
সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যম কল্যাণের অসাধারণ সুযোগও সৃষ্টি করে। ইসলামী বক্তৃতা, কোরআন তিলাওয়াত, দাওয়াতি বিষয়বস্তু, দাতব্য উদ্যোগ, মুহূর্তেই লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
 
একজন মুসলমান এগুলোকে ব্যবহার করতে পারে: 

** উপকারী ও প্রামাণিক জ্ঞান প্রচারে। 
 
** দয়া, ইতিবাচকতা ও নৈতিকতার বার্তা ছড়াতে। 
 
** দাতব্য কাজে সহায়তা করতে। 
 
** পণ্ডিত ও জ্ঞানচর্চার উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত হতে। 
 
** নিজে ও অন্যদের ঈমান শক্তিশালী করতে। 
 
** সৎভাবে ব্যবহার করা হলে প্রযুক্তি ‘সাদাকাহ জারিয়াহ’-র মাধ্যম হতে পারে।
 
** ঈর্ষা, তুলনা ও অহংকার থেকে দূরে থাকা। 
 
সামাজিক মাধ্যম প্রায়ই তুলনার সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে মানুষ সম্পদ, সৌন্দর্য, ভ্রমণ, সাফল্য প্রদর্শন করে। এর ফলে হিংসা, অসন্তোষ ও রিয়ার মতো রোগ জন্মাতে পারে। ইসলাম সন্তুষ্টি ও আন্তরিকতার শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনের সাফল্যের মাপকাঠি আল্লাহর নৈকট্য, অনলাইন জনপ্রিয়তা নয়।
 
তথ্য যাচাই করা
 
অনলাইনে ভুয়া খবর, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানো খুব সহজ। ইসলাম ভিত্তিহীন তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
 
কোরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও…” (৪৯:৬) নিশ্চিত নয় এমন তথ্য প্রচার সমাজে বিভ্রান্তি ও ক্ষতির জন্ম দিতে পারে।
 
বাস্তব সম্পর্ক অটুট রাখা
 
ডিজিটাল যোগাযোগ যতই উন্নত হোক, এটি বাস্তব সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে। ইসলাম পরিবার, আত্মীয়তা, প্রতিবেশী ও সমাজের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। স্ক্রিনের সামনে অতিরিক্ত সময় কাটানো বাস্তব জীবনের যোগাযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
 
মুসলমানদের জন্য ব্যবহারিক নির্দেশনা
 
** ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে। 
 
** উদ্দেশ্য ঠিক করে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করুন।
 
** সময়সীমা নির্ধারণ করুন।
 
** উপকারী অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করুন এবং ক্ষতিকর বিষয় পরিহার করুন।
 
** অকারণ তর্ক-বিতর্ক থেকে দূরে থাকুন।
 
** বিনয় ও গোপনীয়তা রক্ষা করুন।
 
** তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করুন।
 
** জ্ঞান ও কল্যাণ ছড়াতে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুন।
 
** মাঝে মাঝে ডিজিটাল ডিটক্স করে ইবাদত, চিন্তা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।