সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে সাগরদ্বীপে শিশুদের ‘দিদিমণি’, মানবতার অনন্য নজির সান্ড্রার
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, গঙ্গার মোহনায় বঙ্গোপসাগর ঘেরা সাগরদ্বীপ। গঙ্গাসাগর মেলা ও কপিল মুনির আশ্রমের জন্য বিশ্বজোড়া পরিচিত এই দ্বীপেরই এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতিদিন ভোরে শিশুদের হাসির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে একটি ছোট্ট স্কুল। আর সেই স্কুলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন সুইজারল্যান্ডের সমাজকর্মী সান্ড্রা লাভি গোজকোভিচ—যিনি একসময় দুবাই ও সুইজারল্যান্ডে বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
মাত্র দুটি শার্ট, দুটি প্যান্ট আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে একদিন তিনি চেপে বসেছিলেন ভারতগামী বিমানে। পেছনে ফেলে এসেছিলেন মোটা বেতনের চাকরি, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি এবং আর্থিক নিরাপত্তায় ভরা জীবন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকা জীবনের পূর্ণতা নয়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত সার্থকতা।
সাগরদ্বীপে এসে প্রথমে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেন সান্ড্রা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, অনেক উদ্যোগের মধ্যেই স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, একেবারে শূন্য থেকে নিজের মতো করে কাজ শুরু করবেন। শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গ্রামের মানুষ প্রথমে বিদেশিনী এই মহিলাকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেননি। মাসের পর মাস তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝান, শিক্ষা কীভাবে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের সমাজকর্মী সান্ড্রা লাভি গোজকোভিচ
সেই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজ চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে সান্ড্রার উদ্যোগে প্রায় ১৫০ জন শিশুর জন্য একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে। পাশাপাশি সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়া আরও ১২০ জন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচ, টিউশন ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শুধু শিশুদের শিক্ষা নয়, গ্রামের মহিলাদের স্বনির্ভর করতেও কাজ করছেন তিনি। প্রায় ২০ জন মহিলাকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা নিজেরা উপার্জন করতে পারেন।
সান্ড্রার কাজের পরিধি এখানেই শেষ নয়। বাল্যবিবাহ, পারিবারিক নির্যাতন এবং মানব পাচারের মতো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষার আলো শুধু একটি শিশুর জীবন নয়, একটি গোটা পরিবার এবং সমাজকে বদলে দিতে পারে।
সমাজকর্মী সান্ড্রা লাভি গোজকোভিচ
এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি উপলব্ধি করেছেন, স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তনের বীজ বপন হয় শহরের ঝলমলে প্রান্তরে নয়, বরং প্রত্যন্ত গ্রামের মাটিতে। তিনি বলেন, “শিশুদের মুখের হাসি আমাকে যে আনন্দ দেয়, তা কোনও বিলাসবহুল জীবন দিতে পারেনি। আমার যা প্রয়োজন, সবই এখানে আছে।”
আজ সাগরদ্বীপের মানুষ তাঁকে আর বিদেশিনী বলে মনে করেন না। তিনি এখন তাদেরই একজন—শিশুদের প্রিয় ‘দিদিমণি’, মহিলাদের ভরসার মানুষ এবং গ্রামের পরিবর্তনের মুখ। গঙ্গাসাগরের পবিত্র তীরের এই ছোট্ট গ্রামে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নতুন করে শিখিয়ে দিচ্ছেন, সত্যিকারের সম্পদ অর্থ নয়—মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর ক্ষমতাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।