স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই অমর মন্ত্র এবার আইনি বর্মে! ফিরছে বঙ্কিমের গৌরব, ‘বন্দে মাতরম’ বিকৃতি রুখতে নয়া বিল নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
বঙ্কিম ভবন গবেষণাকেন্দ্র সংগ্রহশালার ভেতরের দৃশ্য
বঙ্কিম ভবন গবেষণাকেন্দ্র সংগ্রহশালার ভেতরের দৃশ্য
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

পরাধীন ভারতের সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলম থেকে লেখা হয়েছিল একটি মন্ত্র, ‘বন্দে মাতরম’। এই শব্দই পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। ফাঁসির মঞ্চের দাঁড়িয়েও বিপ্লবীরা অকুতোভয়ে এই স্লোগান তুলতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই গান প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৫ সালের ০৭ নভেম্বর সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গদর্শনে। পরবর্তীকালে, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর চিরকালীন উপন্যাস আনন্দমঠ-এ অন্তর্ভুক্ত করেন এই গানটি। আনন্দমঠ ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়। এই গানে প্রথম সুর সংযোজন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 
 
২০২৬ সালে এসে বন্দে মাতরমের সার্ধশতবর্ষের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের সেই কালজয়ী সৃষ্টি অবশেষে পেতে চলেছে এক আইনি স্বীকৃতি। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত ‘জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ সংশোধনী বিল ২০২৬’ যেন বাঙালীর প্রিয় সাহিত্যিকের অমর সৃষ্টির ঋণশোধের এক দৃষ্টান্ত।
 
বঙ্কিম ভবন গবেষণাকেন্দ্র সংগ্রহশালার ভেতরের দৃশ্য
 
প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে ঘিরে আনা হচ্ছে কঠোর নিয়ম। গান চলাকালীন মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া, বিকৃত করা কিংবা গাইতে বাধা দেওয়ার মতো কাজ করলে এবার হতে পারে হাজতবাস। দোষী প্রমাণিত হলে কপালে দুঃখ আছে। তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা দুইই হতে পারে অভিযুক্তদের। বলা হচ্ছে, এই গান চলাকালীন প্রত্যেক নাগরিককে উঠে দাঁড়িয়ে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। রাজনৈতিক ঔদাসীন্য ঝেড়ে ফেলে এত বছর পর এই বিল যেন জাতীয়তাবোধের এক নিদর্শন গড়ে তুলতে চলেছে।
 
কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বঙ্কিম-গবেষক থেকে শুরু করে তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম। বিশিষ্ট বঙ্কিম-গবেষক ডঃ বিজুলী সরকার তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, বন্দেমাতরমকে নিয়ে এমন ভাবনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তিনি দাবি করেন, এই আইন অনেক আগেই আনা প্রয়োজন ছিল।
 
বঙ্কিম ভবন গবেষণাকেন্দ্র সংগ্রহশালার ভেতরের দৃশ্য
 
দুর্ভাগ্যবশত, পূর্বতন সরকারগুলো একে নিয়ে শুধুই রাজনীতি দেখেছে, যার ফলে পার পেয়ে গেছে বিভেদকামীরা। অথচ এই এক মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরাধীন ভারতে দেশমাতাকে রক্ষা করতে শত শত তরুণ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এই আইন বলবৎ হলে মানুষের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ হবে। মোদিজী সত্যিকারের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
 
ডঃ বিজুলী সরকারের বক্তব্যের সুরে সুর মিলিয়ে কেন্দ্রের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন  বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবারের আত্মীয় ও পরবর্তী প্রজন্মেরা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ের ঘরের নাতি সুশান্ত মুখার্জি বলেন, আইন কার্যকরী হলে তো ভালোই হয়। এই গানটি সব জায়গায় যদি গাওয়া হয় তা দেশের গর্ব।
 
ডঃ বিজুলী সরকার (গবেষক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
 
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চম পুরুষ শান্তনু চট্টোপাধ্যায় এর স্ত্রী বর্ণালী চ্যাটার্জি জানালেন, যদি পুরো গানটি গাওয়ার জন্য আইন করা হয় তাহলে আমারা ভীষন খুশি হব। বহুদিন ধরেই খন্ডিত বন্দেমাতরম গেয়ে আসছি। তাঁকে কখনোই যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এই সরকার অখন্ড বন্দেমাতরমকে যোগ্য মর্যাদা দিচ্ছে তাতে আমরা পরিবারের লোকেরা আপ্লুত।
 
বর্ণালীদেবীর মতে, বঙ্কিমচন্দ্রের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই অমর সৃষ্টিকে অক্ষত রাখা প্রতিটি ভারতীয়র পবিত্র কর্তব্য। এই আইনি স্বীকৃতি বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে চিরভাস্বর করে রাখবে। 
 

অনেকেই মনে করছেন, নতুন এই বিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার বুঝিয়ে দিল, জাতীয় আবেগের অবমাননা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না প্রশাসন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টির এই আইনি পুনরুত্থান নতুন প্রজন্মের কাছে এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে এই সরকার। আজ এত বছর পর সাহিত্য সম্রাটের সেই অমোঘ মন্ত্র আইনি সুরক্ষায় যেন হচ্ছে আরও বলিষ্ঠ। এবার থেকে কোটি কোটি ভারতীয়র কণ্ঠে সমবেতভাবে শোনা যাবে অখন্ড বন্দেমাতরম।