পুরীর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম, বাংলার সর্ববৃহৎ— ৬৩০ বছরের মাহেশের রথে আজও ইতিহাসের চাকা ঘোরে

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
পুরীর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম, বাংলার সর্ববৃহৎ— ৬৩০ বছরের মাহেশের রথে আজও ইতিহাসের চাকা ঘোরে
পুরীর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম, বাংলার সর্ববৃহৎ— ৬৩০ বছরের মাহেশের রথে আজও ইতিহাসের চাকা ঘোরে
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশ। নামটি উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে এক বিশাল রথ, লাখো মানুষের ঢল, ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত জনসমুদ্র আর ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বহমান এক অবিনশ্বর ঐতিহ্যের ছবি। পুরীর জগন্নাথধামের পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ রথ উৎসব হিসেবে মাহেশের রথযাত্রা আজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও লোকজ জীবনের এক অমূল্য সম্পদ।
 
 
১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভক্ত ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী-র উদ্যোগে এই রথযাত্রার সূচনা। লোককথায় রয়েছে, পুরীতে জগন্নাথদেবের দর্শন না পেয়ে তিনি গভীর ব্যথিত হলে স্বপ্নাদেশে প্রভু তাঁকে গঙ্গার তীরে মাহেশে মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। সেই থেকেই শুরু হয় মাহেশের জগন্নাথ আরাধনা। পরবর্তীকালে শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায় এখানে মন্দির নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ধীরে ধীরে মাহেশ পরিচিতি পায় ‘নব নীলাচল’ নামে। 
 
২০২৬ সালে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ৬৩০তম মাহেশ রথযাত্রা। রথযাত্রার বহু দিন আগে থেকেই মাহেশ জুড়ে শুরু হয় প্রস্তুতি। কাঠামো মেরামত, রঙের প্রলেপ, ফুল ও আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন রথ। চারদিকে বসে বিশাল রথমেলা। মিষ্টি, খেলনা, হস্তশিল্প, নাগরদোলা, সার্কাস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে মাহেশ যেন এক বিশাল লোকউৎসবে পরিণত হয়। 
 
বর্তমানে ব্যবহৃত রথটির বয়স প্রায় ১৩১ বছর। প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতা, ১২৫ টন ওজন, চারতলা বিশিষ্ট এই বিশাল রথে রয়েছে ১২টি লোহার চাকা। হাজার হাজার ভক্ত একসঙ্গে রশি টেনে রথকে এগিয়ে নিয়ে যান। সেই দৃশ্য শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, বাংলার সামাজিক ঐক্য ও সমবেত বিশ্বাসেরও এক বিরল প্রতীক। 
 
রথযাত্রার আগে অনুষ্ঠিত হয় স্নানযাত্রা। এ বছরও ২৮ ঘড়া গঙ্গাজল ও দেড় মণ দুধ দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মহাস্নান সম্পন্ন হয়েছে। এরপর প্রাচীন রীতি মেনে দেবতারা ‘অনাবসর’-এ যান। বিশ্বাস, স্নানের পর দেবতারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই মন্দিরের দরজা কয়েক দিন বন্ধ থাকে এবং কবিরাজি চিকিৎসার প্রতীকী আচার পালিত হয়। এরপর ‘নবযৌবন উৎসব’-এ দেবতারা নতুন রূপে রাজবেশে দর্শন দেন। এই বিশেষ দর্শনের জন্য হাজার হাজার ভক্ত ভিড় জমান মাহেশে।
 
৬৩০ বছরের মাহেশের রথ
 
রথযাত্রার দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে মূল মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের গুন্ডিচা বা মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আট দিন অবস্থানের পর উল্টোরথে পুনরায় মূল মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন। এই যাত্রাপথে রথের রশি স্পর্শ করাকেও ভক্তরা পরম সৌভাগ্য বলে মনে করেন। মাহেশের রথ মানেই প্রসাদের ঐতিহ্য। খিচুড়ি, অন্নভোগ ও পায়েস—এই তিন প্রসাদ ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। পাশাপাশি মেলাজুড়ে জিলিপি, পাঁপড়, বাতাসা, নানা লোকজ খাবারের দোকান এবং গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
 
এ বছরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য শিবির, পানীয় জলের ব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি এবং ভিড় সামলাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লক্ষাধিক ভক্তের সমাগমকে সামনে রেখে প্রশাসন, মন্দির কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে উৎসব পরিচালনা করছেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও ঐতিহাসিক রথযাত্রাগুলির জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 
 
আজকের মাহেশের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই রথের চাকা যেমন এগিয়ে চলেছে, তেমনি এগিয়ে চলেছে বাংলার বিশ্বাস, ভক্তি এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।পুরীর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ এই রথযাত্রা তাই শুধু মাহেশের নয়—সমগ্র বাংলার গর্ব, ভারতীয় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।