সুন্দরবনের নদীর পাড়ে কী ঘটছে! ইঞ্জিনিয়ারের দল কেন চুপিচুপি তৈরি করছেন প্রাকৃতিক দেওয়াল, সীমান্তে রাতারাতি এ কিসের প্রস্তুতি?
তরুণ নন্দী / কলকাতা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকে রাজ্য ও কলকাতাকে বারবার নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জঙ্গল যেন প্রাকৃতিকভাবে প্রাচীর গড়ে তুলেছে, যাতে দুর্যোগের আঁচ না পড়ে মনুষ্যজীবনে। কিন্তু যেভাবে এই ম্যানগ্রোভ নষ্ট হচ্ছে তাতে বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবনের এই সবুজ প্রাচীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবার এক অভূতপূর্ব উদ্যোগে এগিয়ে এলেন রাজ্য সরকারের ইঞ্জিনিয়াররা।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের কালিতলা গ্রাম পঞ্চায়েতের ১ নম্বর সমশেরনগর গ্রামে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ঝিঙ্গাখালী নদীর তীরে আয়োজিত হলো এক বিশেষ কর্মসূচি। 'প্রগ্রেসিভ ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল নতুন করে ম্যানগ্রোভের সবুজ প্রাচীর গড়ে তুলে সুন্দরবন তথা গোটা বাংলাকে বিপর্যয় থেকে বাঁচানো।
'প্রগ্রেসিভ ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি
অতীতে আমফান, ইয়াস, কিংবা বুলবুল সহ প্রতিটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগকে আটকে দিয়ে দক্ষিণবঙ্গকে বড়সড় ধ্বংসলীলার হাত থেকে রক্ষা করেছে সুন্দরবনের সুন্দরী, গরান, হেতাল, গেওয়া আর কেওড়ার জঙ্গল। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ক্রমাগত মাটি ধসে গিয়ে নদীভাঙন হচ্ছে। পাশাপাশি ঝড়ের দাপটে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে সুন্দরবনে গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক প্রাচীর। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে রাজ্য সরকারের গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব সামলে এবার প্রাকৃতির সেবায় নামলেন রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি ইঞ্জিনিয়াররা।
সুন্দরবন অঞ্চলের কালিন্দী ও ঝিঙ্গাখালী নদীর সংযোগস্থলে এক বিশেষ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন হাড়োয়া ব্লকের ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জীব মণ্ডল, পিডব্লিউডি-র ইঞ্জিনিয়ার পঞ্চানন চক্রবর্তী ও প্রসুন প্রামাণিক, জলসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জয় দেবনাথ ও শঙ্কর প্রসাদ রায়, সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লকের ডেপুটি সেক্রেটারি শৈলেন মণ্ডল, বিশিষ্ট শিক্ষক অরূপ গায়েন সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
'প্রগ্রেসিভ ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বসিরহাট সংগঠনিক জেলা বিজেপি সভানেত্রী সরস্বতী মন্ডল, হিঙ্গলগঞ্জ চার মণ্ডল সভাপতি, বাবুরাম মণ্ডল ভাইস প্রেসিডেন্ট বিষ্ণু মন্ডল এবং অনন্ত মন্ডল, সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় মন্ডল, সমশেরনগর এক নম্বর গ্রামের ২৫৩ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি রঞ্জিত মল্লিক।
ইঞ্জিনিয়ারদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে ভুললেন না স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব। ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আধিকারিকরা জানান, শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাজ বা পরিকাঠামোগত উন্নয়নই তাঁদের কাছে শেষ কথা নয়। যে পরিবেশের ওপর পুরো রাজ্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে তাকে রক্ষা করাও সমান জরুরি তাঁদের কাছে। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে শতাধিক খুদে পড়ুয়ার হাতেও তুলে দেওয়া হয় চারা গাছ।
ব্লু-প্রিন্ট আর নির্মাণশৈলীর কাজকর্ম ছেড়ে নদীপাড়ে ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করে ইঞ্জিনিয়াররা বার্তা দিলেন, সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে বাংলা। তাই এদিন সরকারি দপ্তর সামলানোর পাশাপাশি আগামী দিনেও প্রকৃতি ও সমাজের স্বার্থে এমন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন তাঁরা।