প্রতিকূলতাকে জয় করে নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.কম-এ শীর্ষস্থানাধিকারী দুই মুসলিম কন্যা

Story by  Aparna Das | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
নাহিন পারভিন ও ওয়াহিদা বেগম তাপাদার
নাহিন পারভিন ও ওয়াহিদা বেগম তাপাদার
 
অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি

সাফল্যের গল্প কখনও শুধু নম্বরের গল্প নয়; তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ, সংগ্রাম, অশ্রু আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির ইতিহাস। জীবনের কঠিনতম সময়েও যারা লক্ষ্য থেকে সরে যায় না, তারাই একদিন অন্যদের পথ দেখায়। নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের বি.কম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনকারী ওয়াহিদা বেগম তাপাদার ও নাহিন পারভিন সেই বাস্তবতারই উজ্জ্বল উদাহরণ। একজন বাবার অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, অন্যজন আর্থিক সংকটের মাঝেও টিউশন পড়িয়ে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ভিন্ন রাজ্য থেকে এসে নাগাল্যান্ডকে নিজের শিক্ষার ঠিকানা বানানো এই দুই মুসলিম তরুণীর সাফল্য আজ শুধু একটি ফলাফলের গল্প নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এক শক্তিশালী বার্তা, পরিস্থিতি নয়, দৃঢ় সংকল্পই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। আওয়াজ দ্য ভয়েস-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন তাঁদের সংগ্রাম, সাফল্য এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
 
নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.কম (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন ওয়াহিদা বেগম তাপাদার। অসমের করিমগঞ্জ তাঁর আদি বাড়ি হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ডিমাপুরে বড় হয়েছেন। সেন্ট মেরিজ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে মাধ্যমিক, ক্রিশ্চিয়ান হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে উচ্চমাধ্যমিক এবং পরে এমজিএম কলেজে বি.কম (অনার্স)-এ ভর্তি হন। নতুন FYUGP ব্যবস্থার অধীনে সপ্তম ও অষ্টম সেমিস্টার সম্পন্ন করেন পাবলিক কলেজ, ডিমাপুরে। সেখান থেকেই তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
 
ওয়াহিদা বেগম তাপাদার
 
তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। সেমিস্টারের শুরুতেই বাবা ক্রনিক কিডনি ডিজিজে (CKD) গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য চেন্নাই, কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে বাবার সঙ্গে থাকতে হওয়ায় প্রায় দুই মাস কলেজে যেতে পারেননি তিনি। তবুও পড়াশোনা ছাড়েননি। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ওয়াহিদা বলেন, "সেমিস্টারের শুরুতেই বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রায় দু'মাস কলেজে যেতে পারিনি। কিন্তু আমি ভেঙে পড়িনি। কলেজে ফিরে শিক্ষকরা আমাকে আলাদা করে গাইড করেছেন, আর পরিবারের সমর্থন আমাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।"
 
পড়াশোনার ক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বাস, মুখস্থ নয়, বিষয়টি বুঝে শেখাই দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের চাবিকাঠি। তিনি বলেন "আমি মুখস্থ করে পড়ি না, বিষয়টা বুঝে পড়ি। একবার ভালোভাবে বুঝে গেলে সেটা অনেকদিন মনে থাকে। তাই পরীক্ষায় নিজের ভাষায় উত্তর লিখতে সুবিধা হয়,"।
 
ওয়াহিদা জানান, শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা, পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস মিস করলেও ইউটিউব দেখে তিনি সেই ঘাটতি পূরণ করেছেন। উচ্চমাধ্যমিকে ৯১ শতাংশ নম্বর পেয়ে একটি মেধাবৃত্তিও অর্জন করেন। ভবিষ্যতে চাকরির পাশাপাশি বি.এড. করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
 
নাহিন পারভিন তাঁর মা ও বাবার সঙ্গে
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, "নাগাল্যান্ডে কমার্স শিক্ষার মান আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তবে শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগ, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং ডিজিটাল দক্ষতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।" নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, "একজন নারী শিক্ষিত হলে তিনি আত্মনির্ভরশীল হন এবং নিজের অধিকারের জন্য দাঁড়াতে পারেন। শিক্ষাই একজন নারীর সবচেয়ে বড় শক্তি।"
 
নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের বি.কম (অনার্স ও রিসার্চ) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন নাহিন পারভিনও। বিহারের মুজফ্ফরপুর জেলার ছোট্ট গ্রাম রিপুরার বাসিন্দা হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ডিমাপুরে বেড়ে উঠেছেন। অ্যাসেম্বলি অব গড হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে হলি ক্রস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। পরে পাবলিক কলেজ, ডিমাপুর থেকে বি.কম সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থান অর্জন করেন।
 
তাঁর পথের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আর্থিক সংকট। বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত টিউশন পড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। দিনের বেলা কলেজ, সন্ধ্যায় টিউশন এবং রাতে নিজের পড়াশোনা, এভাবেই চলেছে তাঁর প্রস্তুতি। নাহিন বলেন, "বাবার হারিয়ে যাওয়া ব্যবসাকে একদিন আবার দাঁড় করাতে চাই। সেই স্বপ্নই আমাকে কমার্স নিয়ে পড়তে এবং আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।"
 
ওয়াহিদা বেগম তাপাদার এবং নাহিন পারভিন অন্য দুজন শীর্ষস্থানাধিকারী শিক্ষার্থী ও কলেজের অধ্যাপকদের সঙ্গে
 
এরই মধ্যে ষষ্ঠ সেমিস্টারে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই সময়ে নিজের পড়াশোনা এবং টিউশনের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিও সামলাতে হয়েছে তাঁকে। সেই কঠিন সময়ে বাবা-মায়ের সমর্থনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। "আমার মা নিজেও অসুস্থ ছিলেন। তারপরও তিনি সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে আমি শুধু পড়াশোনায় মন দিতে পারি। এই সাফল্য যতটা আমার, ততটাই আমার বাবা-মায়ের," বলেন নাহিন।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়ার খবর শুনে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, "আমি ভেবেছিলাম হয়তো মেধাতালিকায় জায়গা পাব, কিন্তু প্রথম হব, এটা কখনও ভাবিনি। বাবা-মায়ের চোখে আনন্দের জল দেখেই মনে হয়েছে, আমার সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।"
 
বাণিজ্য বিভাগ বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল বাবার হারিয়ে যাওয়া ব্যবসাকে একদিন আবার দাঁড় করানোর স্বপ্ন। সেই লক্ষ্যই তাঁকে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তোলে। ভবিষ্যতে এমবিএ করে একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া এবং বাবার হারিয়ে যাওয়া ব্যবসাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, "সময়কে মূল্য দিন, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করবেন না। নিয়মিত পড়াশোনা, রিভিশন এবং বিনয়ী মনোভাবই একদিন আপনাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেবে।"
 
 
দুই ভিন্ন রাজ্য থেকে এসে নাগাল্যান্ডকে নিজের শিক্ষার ঠিকানা বানানো ওয়াহিদা বেগম তাপাদার এবং নাহিন পারভিন দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রতিকূলতা কখনও স্বপ্নের শেষ কথা নয়। অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সমর্থন এবং শিক্ষার প্রতি অটুট নিষ্ঠাই তাঁদের পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের শিখরে। তাঁদের এই অর্জন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আগামী প্রজন্মের কাছে সাহস, অধ্যবসায় এবং সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


শেহতীয়া খবৰ