‘মেয়েদের বলি, বেরিয়ে এসো’, ১৬ বছর ধরে বিনামূল্যে অভাবী আদিবাসী মেয়েদের জীবন বদলে দিচ্ছেন গৃহবধূ ভারতী মুদি
তরুণ নন্দী / কলকাতা
ফ্যানভাত খেয়েই চলে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন। কোন ‘গুরুদক্ষিণা’ ছাড়াই এক আদিবাসী গৃহবধূ ১৬ বছর ধরে ফুটবল শেখাচ্ছেন। তাঁর কোচিং থেকে শিক্ষা নিয়ে বদলে গেছে বহু আদিবাসী মেয়ের জীবন। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ২০০৯ সালে শুরু হয়েছিল ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবির। সেই থেকে আজও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন মহিলা ফুটবল কোচ। বর্তমানে প্রায় ২৫ জন আদিবাসী কিশোরী নিয়মিত তাঁর কাছে ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
বিগত ১৬ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকের দুমদুমি গ্রামে নিরসল পরিশ্রম করছেন আদিবাসী গৃহবধূ ভারতী মুদি। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখন আন্তর্জাতিক ময়দান কাঁপাতে তৈরি হচ্ছে আদিবাসী কিশোরীরা। আর তাঁদের এই স্বপ্নের সলতে পাকানোর কারিগর হলেন বাঁকুড়ার গর্ব ভারতী দেবী।
আদিবাসী কিশোরীদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মুহূর্তে ভারতী মুদি
কথা প্রসঙ্গে ভারতী মুদি বলেন, ছোটবেলায় পায়ে ফুটবল নিয়ে মাঠ কাঁপানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সমাজ, সুযোগের অভাবের সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে হওয়ার তকমা যেন তাঁর সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে নিজের স্বপ্নকে শেষ হতে দেননি তিনি। নিজের ইচ্ছেপূরণ হয়নি ঠিকই, কিন্তু সমাজের বেড়াজাল টপকে ২০০৯ সালে তিনি শুরু করেন এক অন্য লড়াই। স্বামীকে পাশে নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মেয়েদের জন্য খুলে ফেলেন ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবির।
শিক্ষার্থীরা সকলেই প্রায় অভাবী ঘরের। ফলে ফুটবলের সরঞ্জাম কেনার সাধ্য কারও নেই। তাতে কি, কোচিং চালাতে ফুটবল, বুট, জার্সি সহ অধিকাংশ খেলার সরঞ্জাম নিজের উদ্যোগেই সংগ্রহ করেন ভারতীদেবী। তবে তাঁর এই কঠিন সংগ্রামে সবসময় আর্থিকভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে পাশে থাকেন তাঁর স্বামী। কোনো সরকারি অনুদান ছাড়াই শুধুমাত্র লক্ষ্য স্থির করে এগিয়ে চলেছে এই ফুটবল শিবির। উদ্দেশ্য একটাই, প্রান্তিক পরিবারে জন্মালেও যেন কোনও মেয়ের স্বপ্ন মাঠের বাইরে হারিয়ে না যায়।
আদিবাসী কিশোরীদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মুহূর্তে
ভারতীদেবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ফুটবল শিবিরের অনেক মেয়েই পুষ্টিকর খাবার তো দূরস্ত, ঠিক মত জোটে না ফ্যানভাত। তবুও সব কিছু উপেক্ষা করেই বুট পরে অনুশীলনে নেমে পড়ে এই লড়াকু আদিবাসী কন্যারা। আসলে এই মেয়েদের পায়ে বল আর চোখে যখন বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন থেকে যায়, তখন খিদেও হার মানতে বাধ্য হয়।
জানা গেল, কোচ ভারতী মুদির প্রশিক্ষণে এই কোচিংয়ের মেয়েরা আজ শুধু রাজ্য নয়, গোয়া, চণ্ডীগড় ও ভোপালের মতো জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতাতেও নিজেদের প্রতিভা প্রমাণ করেছে। খেলাধুলার সুবাদে অনেকে পেয়ে গেছে সরকারি চাকরির সুযোগ। এমনকি ভারতী দেবীর নিজের মেয়েও আজ একজন সফল ফুটবল রেফারি বলেও পরিচিত ফুটবল মহলে। মাঠে অনুশীলনেই ভারতী মুদি আবেগে বলেই দিলেন, যতদিন মেয়েরা ফুটবল খেলতে চাইবে, ততদিন আমি তাদের পাশে থাকব।
আদিবাসী সমাজে বাল্যবিবাহ রোধে অনেকটা ভূমিকা রয়েছে এই ভারতীর। তিনি গোটা দুমদুমি গ্রামে মেয়েদের জন্য ফুটবল বিপ্লব এনে দিয়েছেন। বলা ভালো, এই আদিবাসী মহিলা তৈরি করছেন এক আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর এবং লড়াকু মেজাজের নতুন প্রজন্ম। যারা বাঁকুড়ার লাল মাটি থেকে ডানা মেলতে চায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ভারতী মুদির এই লড়াই আজও বহু আদিবাসী মেয়েদের কাছে এক অনুপ্রেরণা।