মুসলিম অধ্যাপকের বাড়ি থেকেই শুরু জগন্নাথের পরিক্রমা, হাওড়ার রথযাত্রায় সম্প্রীতির অনন্য নজির

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
মুসলিম অধ্যাপকের বাড়ি থেকেই শুরু জগন্নাথের পরিক্রমা, হাওড়ার রথযাত্রায় সম্প্রীতির অনন্য নজির
মুসলিম অধ্যাপকের বাড়ি থেকেই শুরু জগন্নাথের পরিক্রমা, হাওড়ার রথযাত্রায় সম্প্রীতির অনন্য নজির
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

রথযাত্রা মানেই কাঠের বিশাল রথ, দড়ি টেনে ভক্তদের উচ্ছ্বাস। কিন্তু হাওড়ার কদমতলায় রয়েছে এক ব্যতিক্রমী রথযাত্রা, যেখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পরিক্রমা শুরু হয় এক মুসলিম পরিবারের বাড়ি থেকে। বছরের পর বছর ধরে এই ঐতিহ্য শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
 
 
 
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু শেখ মকবুল ইসলাম। তিনি কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল মিশন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। রথযাত্রার দিন প্রতিবেশী হিন্দু পরিবারগুলির সঙ্গে কাঁধে করে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ নিয়ে এলাকার বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করেন তিনি। এখানে কোনও কাঠের রথ ব্যবহার করা হয় না; ভক্তরা নিজেরাই দেবতাদের বহন করেন।
শেখ মকবুল ইসলামের শৈশব কেটেছে মিশন কোয়ার্টারে। তাঁর বাবা সেখানেই কর্মরত ছিলেন। ছোটবেলায় ওড়িশা থেকে আসা বহু বৈষ্ণব পরিবারের সংস্পর্শে এসে জগন্নাথ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। সেই টান আজও অটুট।
 
হাওড়ার বাগনান তাঁর পৈতৃক ভিটে। সেখানে রথের মেলা ছিল তাঁর শৈশবের অন্যতম আকর্ষণ। কাগজের ভেঁপু, কর্কের তৈরি রঙিন পাখি, গরম জিলিপি, পাপড়—সব মিলিয়ে রথের মেলা ছিল আনন্দের উৎসব। তিনি জানান, শুধু হিন্দু নয়, মুসলিম পরিবারের শিশুরাও সমান উৎসাহে সেই মেলায় অংশ নিত।শুধু ভক্ত হিসেবেই নয়, গবেষক হিসেবেও জগন্নাথ সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক। লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত, ভিজ্যুয়াল ফোকলোর, জগন্নাথ চেতনা, বাংলা-ওড়িশার তুলনামূলক ধর্মচর্চা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন তিনি। সেই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে পুরীর শঙ্করাচার্যের হাত থেকে 'নবকলেবর পুরস্কার' লাভ করেন।
 
 
সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল মিশন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শেখ মকবুল ইসলাম
 
কদমতলার এই শোভাযাত্রা শেষ হয় প্রতিবেশী দীনেশ কুমার খানের বাড়িতে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সেখানেই জগন্নাথদেবের 'মাসির বাড়ি'। সাত দিন সেখানে অবস্থানের পর উল্টো রথের দিনে দেবতারা আবার ফিরে আসেন। এই উপলক্ষে প্রসাদ ও ভোগ বিতরণ করা হয় এবং এলাকার সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে উৎসবে সামিল হন।শোভাযাত্রায় ঢাক, কাঁসর, শঙ্খ, ধূপ-ধুনো ও প্রদীপের আবহে উৎসব মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শিশুদের উৎসাহই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। তাদের অংশগ্রহণে এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে।
 
শেখ মকবুল ইসলামের কথায়, জগন্নাথ সংস্কৃতির মূল দর্শনই হল সকলকে একসঙ্গে নিয়ে চলা। পুরীর রথযাত্রাও এমন এক উৎসব, যেখানে জাতি, ধর্ম বা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই অংশ নিতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস, এই ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চেতনাকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে।
 
হাওড়ার এই ব্যতিক্রমী রথযাত্রা তাই কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি এক সামাজিক বার্তা। ভিন্ন ধর্মের মানুষ যখন একই উৎসবকে নিজেদের উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে 'সম্প্রীতির রথ' এগিয়ে চলে। কদমতলার এই ঐতিহ্য সেই মিলনেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।