জাকিরাজার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের নতুন কণ্ঠ

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 3 d ago
জাকিরাজার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের নতুন কণ্ঠ
জাকিরাজার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের নতুন কণ্ঠ

শ্রীলতা এম

কীরানুর জাকিররাজা তামিল সাহিত্য জগতে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তামিলনাড়ু এবং কখনও কখনও কেরালার প্রান্তিক মুসলিম সমাজের পুরুষ, নারী ও শিশুরা তাঁর উপন্যাসের পাতায় শ্বাস নেয় এবং নতুন জীবন খুঁজে পায়। তাঁর লেখনী সাহসী, সৎ এবং মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল ও গোঁড়ামীর তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। নিজের স্বীকারোক্তিতেই তিনি নিজেকে তামিলনাড়ুর এক ধরনের সালমান রুশদি বলে উল্লেখ করেন। তবে কথাটা বলেই আবার নিজেকে সংশোধন করেন। তিনি বলেন,“আমি বলতে চাইনি যে লেখক হিসেবে আমি তাঁর মতো। আমরা আলাদা। কিন্তু আমাদের প্রতি যে ঘৃণা ও রাগ তৈরি হয়, তা তুলনীয়। মানুষ আমাকে মারধর করার চেষ্টাও করেছে।

তারা আমাকে রুশদি বলে ডাকে…”তাঁর গল্পের প্রধান চরিত্ররা সাধারণত সমাজের প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। তাদের জীবনের বাস্তব ও স্পষ্ট বর্ণনা এবং সাহসী উপস্থাপন মুসলিম সমাজের আরও কট্টর অংশের কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।এই মুহূর্তে তিনি যখন তাঁর নতুন উপন্যাস লিখছেন, তখন জন্ম নিচ্ছে এক নতুন নারী চরিত্র। তার নাম খাদিজাএকজন লেখক, যার কলম নাম নেল্লি। দস্তয়েভস্কির উপন্যাস The Insulted and the Injured-এর একই নামের একটি চরিত্র নেল্লিকে অনুপ্রাণিত করেছে। সেখানে নেল্লি একজন ১০ বছর বয়সী মেয়ে।

কীরানুর জাকিরাজার কিছু সাহিত্যকর্ম

তাঁর অধিকাংশ প্রধান চরিত্র সমাজের ভেতর থেকেই উঠে আসা মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। তাদের জীবনের স্পষ্ট চিত্রায়ন ও নির্ভীক বর্ণনা মুসলিম সমাজের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভের কারণ হয়েছে। সম্প্রতি তিনি একটি নতুন উপন্যাস লিখেছেন, যেখানে জন্ম নিয়েছে এক নতুন নারী চরিত্রতার নাম খাদিজা। তিনি একজন লেখক, কলম নাম নেল্লি। দস্তয়েভস্কির উপন্যাস The Insulted and the Injured-এর একই নামের চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নামকরণ করা হয়েছে। ওই উপন্যাসে নেল্লি ছিল ১০ বছর বয়সী এক কিশোরী।

জাকিরাজা বলেন,“আমার নেল্লি একজন সাহসী নারী। তার দু’বার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, হয়তো তার চেয়েও বেশি। সে এসব বন্ধন থেকে মুক্তি চেয়েছিল এবং লিখতে চেয়েছিল। পরে সে একজন খ্যাতনামা লেখিকায় পরিণত হয়। উপন্যাসটিতে তার লেখা উপন্যাস, গল্প ও কবিতার কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”

জাকিরাজা তাঁর গ্রন্থগুলোকে উত্তর-আধুনিক (পোস্ট-মডার্ন) সাহিত্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি মালয়ালম লেখক বৈকোম মোহাম্মদ বশীর, তাকাঝি ও এম. টি. বাসুদেব নায়ারের পাশাপাশি দস্তয়েভস্কি, কাফকা ও বোর্হেসের মতো বিশ্বসাহিত্যিকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত। তিনি বলেন,“তামিল ভাষায় আমি পুদুমাইপিথান, আসোগামিত্রন ও জয়মোহনকে শ্রদ্ধা করি। মালয়ালম ভাষায় আমি বৈকোম মোহাম্মদ বশীর ও পল জাকারিয়াকে ভালোবাসি।”

তিনি আরও বলেন, তাঁর লেখায় ইংরেজি/মালয়ালম লেখিকা কমলা দাসের লেখার মতো এক ধরনের মুক্ততা ও সততা রয়েছে। তিনি বলেন,“কমলা দাস বা কমলা সুরাইয়া (জীবনের শেষ পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের পর) একজন নারীর অন্তর্জগত নিয়ে তাঁর অস্পষ্ট, নির্মমভাবে সৎ ও তীব্র লেখার জন্য পরিচিত। জীবনের যে কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে আত্ম-সংযম বা আত্ম-সেন্সরশিপ করতে তিনি অস্বীকার করেছেন। আমার চরিত্র নেল্লিও তেমনই একজন।”

কীরানুর জাকিরাজার গ্রন্থ উন্মোচনের মুহূর্ত

তাঁর প্রিয় নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ভাডাক্কেমুরি হালিমা’ উপন্যাসের হালিমা। উপন্যাসটির পটভূমি কেরালার কোচি। ২৫ বছর বয়সী হালিমা অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। কবিতা, সিনেমা ও শিল্পকলায় প্রতিভাবান হলেও, চেন্নাইয়ে বসবাসকারী একজন শিল্পী হিসেবে সে মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেউপন্যাসটির শৈলী অত্যন্ত উত্তর-আধুনিক

এই দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর লেখার প্রধান অনুপ্রেরণা হয়েছে তামিলনাড়ুর সাধারণ মুসলমানদের জীবনবিশেষ করে মুসলিম নারীদের জীবনের প্রতি তাঁর অসন্তোষ। তিনি বলেন, ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে মুসলিম নারীরা খুব কম স্বাধীনতা নিয়ে এক অত্যন্ত রক্ষণশীল সমাজে বসবাস করতেন। তাঁদের গৃহবন্দি করে রাখা হতো এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হতো।তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন অনেক বেশি মুসলিম নারী তাঁদের সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছেন।

জাকিররাজা বলেন, তিনি সব সময় বৈষম্য এবং ইসলামের মৌলবাদী ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে এসেছেনযে ব্যাখ্যাগুলি এক লিঙ্গকে দুর্বল করে তোলে। তাঁর উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি এই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শক্তিশালী নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তিনি কোয়েম্বাটোর বিস্ফোরণের মতো সন্ত্রাসবাদী হামলার বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে মন্তব্য করে বলেন,“এসব ঘটনা মুসলিম সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখার কারণে মানুষ আমাকে আক্রমণের হুমকিও দিয়েছে।”

তিনি ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলোকে উগ্রপন্থী হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, তারা তাঁর বইগুলোর ঘনঘন বিরোধিতা করে আসছেযখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তসলিমা নাসরিন বা সালমান রুশদির মতো তাঁর বিরুদ্ধেও কোনো ফতোয়া জারি হয়েছে কি না, তিনি উত্তরে বলেন যে, তিনি এর থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন

তিনি জানান, তাঁর প্রথম উপন্যাস মীনকারাথেরুভু (মৎস্যজীবীদের জীবন) প্রকাশের পর তাঁকে জামাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি বলেন,“আমি এখনও জামাতে দান করি, যদিও আর তার সদস্য নই।”


কীরানুর জাকিররাজাকে সংবর্ধনা জানানোর দৃশ্য

কীরানুর জাকিররাজা তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু করেছিলেন মন্দিরনগরী পালানি থেকে। আজ তিনি তামিল কথাসাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে এক অত্যন্ত পরিচিত নাম। তিনি তাঁর বিষয়বস্তুর তুলনা করেন এম. টি. বাসুদেব নায়ারের সঙ্গে, যিনি কেরালার নায়ার থারাভাডু (যৌথ পরিবার) জীবনের উপর লেখার জন্য পরিচিত। একই প্রসঙ্গে জাকিররাজা বলেন,“আমি এখানে মুসলিম পরিবারের পুরুষদের এবং বিশেষ করে নারীদের জীবনের কথা লিখেছি।”

তাঁর জীবনেথাঞ্জাভুরএকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কারণ এখানেই তিনি তাঁর গুরুলেখক তাঞ্জাই প্রকাশের সান্নিধ্য লাভ করেনতিনি বলেন,আমি তখনই লেখা শুরু করে দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেনআমার নিজের গল্প এবং যাদের আমি চিনি তাদের গল্প লিখতেসেই কারণেই আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসা সাধারণ মুসলমানদের জীবন নিয়ে লেখা শুরু করি।”

যদিও তাঁর লেখালেখি স্বীকৃতি পেয়েছিল, তবুও এর মাধ্যমে বিশেষ কোনো আর্থিক পুরস্কার তিনি পাননি। তিনি উপ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরে থাঞ্জাভুরের একাধিক সাহিত্য পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন,“তামিলনাড়ুতে লেখকদের কম রয়্যালটি দেওয়া একটি বড় সমস্যা। কেরালায় লেখকরা ২০ শতাংশ রয়্যালটি পান, কিন্তু এখানে মাত্র ১০ শতাংশ দেওয়া হয়।”

জীবিকা নির্বাহের জন্য জাকিররাজা প্রকাশকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেই নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, এটাই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। ১০টি উপন্যাস এবং গল্প ও প্রবন্ধের এক নিরবচ্ছিন্ন ধারার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।


নিজের গ্রন্থের সঙ্গে কীরানুর জাকিররাজা

তিনি উল্লেখ করেন যে, তামিলনাড়ুতে লেখকদের সংগঠন রয়েছে, যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। একসময় তিনি সেসব সংগঠনের সদস্য ছিলেন, তবে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে পরে নিজেকে সেগুলো থেকে দূরে রেখেছেন। একটি দুর্ঘটনার ফলে তিনি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন, এরপর তিনি নিজেকে পুরোপুরি লেখালেখির জন্য উৎসর্গ করেন। তিনি বলেন,“গত দশ বছর ধরে আমি শুধু লিখেই চলেছি।”

জাকিররাজা তাঁর স্ত্রী সালমা বানুর সঙ্গে বসবাস করেন, যাঁকে তিনি গর্বের সঙ্গে একজন উদীয়মান লেখিকা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সম্প্রতি গুরুত্বের সঙ্গে লেখালেখি শুরু করেছেন। তাঁর একটি উপন্যাসের নাম ইদ্দাত, যেখানে ইসলামি প্রথা ‘ইদ্দাহ’-এর ওপর আলোকপাত করা হয়েছেস্বামীর মৃত্যু বা বিবাহবিচ্ছেদের পর নারীর জন্য নির্ধারিত বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময়কাল।উপন্যাসের নায়িকা মরিয়ম কখনও তাঁর স্বামীকে দেখেনি। তবুও স্বামীর মৃত্যুর পর সমাজের কাছে নিজের ‘পবিত্রতা’ প্রমাণ করার জন্য তাকে তিনটি ঋতুচক্র পর্যন্ত ইদ্দাত পালন করতে বাধ্য করা হয়।

মীনকারাথেরুভু উপন্যাসে জাকিররাজা একটি ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের কথা লিখেছেন। তিনি বলেন, এরা উপকূলবর্তী মৎস্যজীবী নন, বরং পালানির কাছের কীরানুরে বসবাসকারী দরিদ্র মুসলমান মানুষ। স্থানীয় পুকুরে মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে, এবং উপন্যাসে তাদের জীবনকথাই তুলে ধরা হয়েছে।

যদিও তিনি উগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন, তবুও জাকিররাজা একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের পক্ষে সওয়াল করেনযেখানে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের বিশ্বাস পালন করতে পারে, নিজের ইচ্ছামতো পোশাক পরতে পারে এবং নিজেদের মতো করে প্রার্থনা করতে পারে। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার এই মৌলিক কাঠামো কখনও বিঘ্নিত হওয়া উচিত নয়।ভাডাক্কেমুরি হালিমা উপন্যাসের একটি অংশে তাঁর লেখার মনোভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। হালিমা যখন একটি শহরে কিছুদিন থাকার ইচ্ছা নিয়ে সেখানে পৌঁছায়, তখন রমজান মাস শুরু হতে চলেছিল। গত দশ বছর ধরে রমজানের প্রথম দিনে সে পুলিয়াকুলামে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিল এবং যাত্রার সময় সবসময় একটি ব্যাগ সঙ্গে রাখত।

শহরের ফুটপাথের কুকুরগুলো তার আগমনের আভাস পেয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে তাকে স্বাগত জানায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সেখানে আর কোনো শব্দ শোনা যায়নি। সাধারণত কুকুরগুলো অপরিচিত লোকদের দেখে ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করে, কিন্তু হালিমা পেয়েছিল এক বিশেষ অভ্যর্থনাযা নিয়ে সে গর্ববোধ করেছিল