প্রান্তিক নারীদের ভরসার এক নাম শরিফা খানম

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 13 h ago
ডি. শরিফা খানম
ডি. শরিফা খানম
 
শ্রীলতা এম

ডি. শরিফা খানমের জীবনকথা কোনও একক মানুষের গল্প নয়, এটি বহু নারীর বেঁচে থাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি। যেসব নারীর পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাই যেন তাঁর জীবনের ভাষা হয়ে উঠেছে। ৬২ বছর বয়সি খানমও বড় হয়েছেন এমন এক পরিবেশে, যেখানে পুরুষের আধিপত্য ও পিতৃতন্ত্রকে স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই মেনে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন তিনিও তাই মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এক সময় সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়; যখন তিনি বুঝতে পারেন, একজন নারী কেবল পুরুষশাসিত সমাজের নির্দেশ মানার জন্য জন্মাননি; তাঁর নিজস্ব সত্তা ও পরিচয় রয়েছে।
 
তামিলনাড়ুর এক গ্রামে দশ ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি পড়াশোনা করেন একটি উর্দু স্কুলে, যেখানে তাঁর মা শিক্ষকতা করতেন। পারিবারিক জীবন সহজ ছিল না। তাঁর মা স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হন।

খানমের এক দাদা পরে আইআইটি কানপুরে পড়াশোনা করেন এবং তিনিই তাঁকে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সাহায্য করেন। আলিগড়ে পড়াশোনার সময়ই তাঁর সামনে খুলে যায় গ্রামের বাইরের এক বিস্তৃত জগৎ, যা তাঁর চিন্তাভাবনাকে আমূল বদলে দেয়।
 
শিক্ষা শেষ করার পর, আশির দশকের শেষ দিকে পাটনায় অনুষ্ঠিত একটি নারী সম্মেলনে তিনি অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় হওয়া বক্তৃতা ও আলোচনা তামিলে অনুবাদ করতে করতেই একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নারীদের দুঃখ-কষ্ট কোনও একটি রাজ্য বা সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ নয়; সর্বত্রই, সব সমাজেই তারা নিপীড়নের শিকার।
 
নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত, নারী অধিকার সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এবং বাস্তব জীবনে সেই অধিকার প্রয়োগের ভয়াবহ অভাব, এই সবকিছু মিলিয়ে তাঁর মনে দৃঢ় সংকল্প জন্ম নেয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, একসময় তিনি নিজেকে সিন্ডারেলার মতো ভাবতেন, নিজের জীবনে কোনও পরী-মায়ের অপেক্ষায়। কিন্তু এই উপলব্ধির পর তিনি ঠিক করেন, তিনি আর অপেক্ষা করবেন না। তিনি নিজেই নিজের পরী-মা হবেন, এবং হবেন তাঁর চারপাশের অসংখ্য নারীরও। পুদুক্কোট্টাইয়ে অল্প কয়েকজন নারীকে নিয়ে তাঁর কাজের শুরু। গৃহশিক্ষা দিয়ে ও শাড়ি কিনে আবার বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জন করতেন, সেই টাকাই ছিল তাঁদের মূল পুঁজি।
 
ডি. শরিফা খানম
 
১৯৮৭ সালে এই ছোট উদ্যোগই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় ‘স্টেপস’ (STEPS) সংগঠনের মাধ্যমে। বিবাহবিচ্ছেদ, গার্হস্থ্য হিংসা, পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য ও সামাজিক একাকীত্ব, এই সব সমস্যা নিয়ে নারীরা তাঁর কাছে আসতে থাকেন। কাউন্সেলিং, মধ্যস্থতা এবং প্রয়োজনে আইনি পথ অবলম্বন করে সমাধানের চেষ্টা চলত। তাঁর কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করে তৎকালীন জেলা কালেক্টর তাঁকে জমি বরাদ্দ করেন, যাতে বড় পরিসরে এই উদ্যোগ চালানো যায়।
 
রেডিফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানম বলেন, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়েও বিশেষভাবে ভাবেননি। কিন্তু পাশের এলাকাগুলিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর সেই অবস্থান বদলে যায়।
 
মুসলিম সমাজের অসহায়তা, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের দুর্বল অবস্থান, তাঁর কাজের দিকনির্দেশ পাল্টে দেয়। এখান থেকেই আসে মুসলিম নারীদের জন্য একটি আলাদা ‘জামাত’ গঠনের ভাবনা। সাধারণত জামাত বলতে মসজিদকেন্দ্রিক পুরুষ প্রবীণদের একটি সমাবেশ বোঝায়, যেখানে সামাজিক বিবাদ ও সমস্যা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খানমের অভিজ্ঞতায়, এই সিদ্ধান্তগুলির বেশিরভাগই নারীদের বিরুদ্ধে যেত।
 
সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন ডি. শরিফা খানম
 
১৯৯১ সালে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম নারীদের জামাত গঠন করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই পথেই নারীদের কণ্ঠস্বর শোনা সম্ভব। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, ধর্মীয় নেতাদের বা পুরুষপ্রধান জামাতগুলিকে অসন্তুষ্ট করার আশঙ্কায় অনেক ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনও মুসলিম নারীদের সমস্যা নিয়ে এগিয়ে আসতে চায় না। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, মুসলিম সমাজকে নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ একটি সংগঠিত রূপ পায় এবং ২০০০ সালে ‘তামিলনাড়ু মুসলিম উইমেনস জামাত কমিটি’ স্টেপসের একটি শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
 
খানমের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, অবিচারের শিকার হলে মুসলিম নারীদের সামনে কার্যত কোনও আশ্রয় নেই। হঠাৎ তালাক, ট্রিপল তালাক, ভরণপোষণ না দেওয়া, গার্হস্থ্য হিংসা, এই সব অভিযোগ প্রায়শই পুলিশ ‘শরিয়ত’ বা মুসলিম পার্সোনাল ল-এর আওতায় পড়ে বলে এড়িয়ে যেত।
 
পুরুষশাসিত জামাতগুলিতে এই ধরনের মামলাগুলি চাপা পড়ে যেত। খানম একে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, কোরানের আরবি লিপির ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যাই এর অন্যতম কারণ।নারীদের কাছে সেই জ্ঞান বা আত্মবিশ্বাস ছিল না, যার মাধ্যমে তারা এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করতে পারে। যখন খানম কোরানের তামিল অনুবাদ পড়েন, তখন তিনি দেখেন, মূল পাঠের সঙ্গে মসজিদকেন্দ্রিক জামাতগুলির চালু ব্যাখ্যার বিস্তর ফারাক রয়েছে।
 
STEPS-এর একটি কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী মহিলারা
 
নারী জামাত শরিয়ত বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করতে শুরু করে এবং ট্রিপল তালাক বাতিল ও নারীদের সম্পত্তির অধিকার কার্যকর করার দাবিতে সরকারের কাছে দাবি জানায়। জামাতের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তামিলনাড়ু মুসলিম উইমেনস জামাত কমিটিকে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা সহ্য করতে হয়েছে, এমনকি ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকিও এসেছে।
 
জেলা স্তরে জামাতের বৈঠক হয় প্রতি মাসে এবং পুদুক্কোট্টাইয়ের সদর দপ্তরে তিন মাস অন্তর। এই বৈঠকগুলিতে নারীরা তাঁদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কাউন্সেলিং, পুলিশি হস্তক্ষেপ কিংবা আদালতের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। যেসব বিষয় নিষ্পত্তি হয় না, সেগুলি কেন্দ্রীয় স্তরের বৈঠকে আলোচিত হয়। খানম বহুবার বলেছেন, জামাতের কাজ শুরু হওয়ার পর তামিলনাড়ুর কিছু মসজিদেও নারীদের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি হয়েছে।
 
একই সঙ্গে, স্টেপস উইমেনস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নির্যাতিত নারীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। এখানে স্বল্পমেয়াদি আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং স্থানীয় সমাজ ও পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্টেপস নারীদের জীবিকা, জমির অধিকার ও কর্মসংস্থানের বিষয়েও উদ্যোগ নিয়েছে।
 
ডি. শরিফা খানম প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী থেকে পুরস্কার গ্রহণের একটি মুহূর্ত
 
এই লেখা প্রস্তুতের সময় শরিফা খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তাঁর দপ্তর থেকেও জামাত বা শুধুমাত্র নারীদের জন্য মসজিদ নির্মাণের ভাবনা নিয়ে কোনও উত্তর আসেনি। তবে অন্যান্য মঞ্চে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, মসজিদ নির্মাণ কখনওই তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল না। আসল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের একত্র করা, তাদের খোলামেলা কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং সম্মিলিতভাবে সমস্যার মোকাবিলা করা, যা জামাত ইতিমধ্যেই করে চলেছে। নির্যাতিত নারীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন স্টেপসের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
 
স্টেপসের ওয়েবসাইটে তাদের মূল দর্শন স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, আত্মসম্মানই নারীমুক্তির ভিত্তি। সংগঠনটি পণ-সংক্রান্ত নির্যাতন, বিবাহবিচ্ছেদজনিত বিরোধ, যৌন হেনস্তা, শিশু যৌন নির্যাতন এবং গার্হস্থ্য হিংসার মতো নানা ধরনের সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা ও কাউন্সেলিং প্রদান করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৩,৫০০ জন নারী এই সহায়তার সুফল পেয়েছেন।
 
শুরুর দিকে স্টেপস স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালাত, কর্মশালা, পোস্টার প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এটি রূপ নেয় সংকটে থাকা নারীদের এক নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে, যা স্থানীয় ও রাজ্য স্তরে সমস্যাগুলি তুলে ধরে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
 
STEPS-এর মধ্যস্থতা শিবিরে অংশগ্রহণকারী মহিলারা
 
প্রায় দুই দশক ধরে ভারতের নারী আন্দোলনে ডি. শরিফা খানম এক নিরলস উপস্থিতি। পুদুক্কোট্টাইকে কেন্দ্র করে পরিচালিত স্টেপস আজও প্রতিদিন হিংসার মামলায় হস্তক্ষেপ করে, পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। এই দীর্ঘ যাত্রার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ অথচ শক্তিশালী বিশ্বাস, প্রান্তিক হয়ে পড়া নারীরাও শোনা যাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে।