দিল্লির আজমেরি গেট এলাকায় একটি জীর্ণ-শীর্ণ হাভেলি আজও অতীতের গৌরবগাথা বহন করে চলেছে। একসময় এই হাভেলিটি বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সায়রা বানুর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই বাড়ির ইতিহাস শুধু দিল্লির রাজকীয় ঐতিহ্যের কথাই বলে না, বরং ভারতীয় সিনেমার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং একটি পরিবারের আবেগঘন সম্পর্কেরও সাক্ষ্য বহন করে।
আজমেরি গেটের কাছেই কুন্ডেওয়ালান গলিতে অবস্থিত এই হাভেলিটিকে নাসিম বানুর পৈতৃক বাড়ি বলে মনে করা হয়। সায়রা বানুর মা নাসিম বানু নিজেও ছিলেন একসময়ের খ্যাতনামা অভিনেত্রী। একসময় এই অঞ্চলটি পুরনো দিল্লির অন্যতম ঐতিহাসিক ও পরিচিত এলাকা ছিল। আজও সেই অতীতের গৌরবের ছাপ এই বাড়ির গায়ে লেগে রয়েছে। এই হাভেলি কেবল একটি পরিবারের স্মৃতির ভান্ডারই নয়, বরং সেই সময়ের সংগীত, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতীকও, যখন দিল্লি তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল।
ধারণা করা হয়, প্রায় ১৬৪৪ সালের দিকে এই হাভেলিটি নির্মিত হয়েছিল। তখন এটি ছিল শাহী দিল্লির অংশ, যেখানে নবাব ও দরবারিদের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মুঘল যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসন, দুই সময়েরই সাক্ষী এই এলাকা। হাভেলির স্থাপত্যেও সেই রাজকীয় ঐশ্বর্যের ছাপ স্পষ্ট ছিল। ভিতরের দেয়ালে সূক্ষ্ম নকশা, কাঠের কারুকাজ এবং লোহার খিলান সেই সময়ের শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হাভেলি তার আগের জৌলুস হারিয়েছে। আজ এটি অনেকটাই ভগ্নদশায়। বাড়ির বেশ কিছু অংশ বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছেন। ঐতিহাসিক মর্যাদা কিছুটা ম্লান হলেও, পুরনো দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি এখনও উল্লেখযোগ্য। পুরনো দিল্লির সরু গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি, তার মাটি আর দরজার চৌকাঠ যেন এখনও অপেক্ষা করছে তার মেয়ে সায়রা বানুর ফিরে আসার।
ভারতীয় সিনেমায় নিজের সৌন্দর্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সায়রা বানুর কাছে এই হাভেলির গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক নয়, গভীর আবেগেরও। এখানেই তিনি ছোটবেলায় তাঁর মা নাসিম বানুর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ফলে এই বাড়ির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একেবারেই ব্যক্তিগত ও হৃদয়ঘন।
নাসিম বানু ও সায়রা বানুর
হাভেলির ঘরগুলোতে একসময় নাসিম বানুর কণ্ঠস্বর, গান-বাজনা আর নাচের রিহার্সালের সুর ভেসে বেড়াত। এখান থেকেই তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরু। আর ছোটবেলায় সায়রা বানুও মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতে নিজের পরিচয় গড়ে তুললেও তিনি কখনও এই বাড়িকে ভুলতে পারেননি। শৈশবের সেই স্মৃতি আজও তাঁর মনে অমলিন।
তবে বর্তমানে এই হাভেলি নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। মালিকানাকে কেন্দ্র করে আদালতে একাধিক মামলা চলছে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা ও ভাড়াটিয়ারা এই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করছেন, অন্যদিকে সায়রা বানুর পরিবারের সদস্যরাও নিজেদের অধিকার দাবি করছেন। এ নিয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে, আইনি অধিকার ছাড়া এই সম্পত্তির কোনও অংশ কেনাবেচা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এই ঐতিহাসিক বাড়ির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
স্থাপত্যের দিক থেকেও এই হাভেলি সেই সময়ের অসাধারণ কারিগরির উদাহরণ। ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় বড় একটি আঙিনা, যার চারপাশে সরু বারান্দা ও করিডর রয়েছে। আঙিনার দুই পাশে সিঁড়ি উঠে গেছে প্রথম তলায়। দেয়ালে সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং লোহার খিলান সেই যুগের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে। যদিও সময়ের আঘাতে অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে, তবুও এটি এখনও একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবেই দাঁড়িয়ে আছে।
আজমেরি গেটের হাভেলির ভেতরের দৃশ্য
একসময় এই বাড়ি ছিল সংগীত ও শিল্পচর্চার কেন্দ্র। নাসিম বানু এবং তাঁর সহশিল্পীরা এখানে গান ও নাচের অনুশীলন করতেন। বাড়ির একটি ঘরে নিয়মিত সংগীত ও নৃত্যের রিহার্সাল হত, যেখানে বহু শিল্পী তাঁদের প্রতিভাকে আরও শাণিত করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
আজও এই হাভেলির গুরুত্ব কমেনি। স্থানীয় বাসিন্দা এবং নির্মাতাদের নজর রয়েছে এই জমির উপর। ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক বাড়ি ভেঙে সেখানে বড় কোনও আধুনিক ভবন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য এতটাই গভীর যে এটিকে সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকেই।
সায়রা বানু ও তাঁর পরিবারের কাছে এই হাভেলি কেবল একটি বাড়ি নয়. এটি স্মৃতি, স্বপ্ন এবং অতীতের এক অমূল্য অংশ। যদি এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি সংরক্ষিত থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি ভারতীয় সিনেমা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে থাকবে।
আজমেরি গেটের হাভেলির ভেতরের দৃশ্য
দিল্লির আজমেরি গেটের এই হাভেলি তাই শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি এক আবেগঘন যাত্রার গল্প, একজন মহান অভিনেত্রী ও তাঁর পরিবারের স্মৃতিতে ভরা একটি ইতিহাস। আজ তা জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ও সংস্কৃতি কখনও হারিয়ে যাবে না। কারণ এই বাড়ি সায়রা বানুর হৃদয় ও আত্মারই একটি অংশ, যা সব পরিস্থিতিতেই অমলিন হয়ে থাকবে।