বসন্তের দ্বারে রুশ উৎসব মাসলেনিৎসা, এক অনির্বচনীয় সেতুবন্ধন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 19 h ago
তিরুবনন্তপুরম কনস্যুলেটে রাশিয়ান উৎসবে লেডি মাসলেনিৎসার দহন প্রতিমা
তিরুবনন্তপুরম কনস্যুলেটে রাশিয়ান উৎসবে লেডি মাসলেনিৎসার দহন প্রতিমা
 
আদিতি ভাদুড়ী

বছরের সেই বিশেষ সময় আবারও উপস্থিত, যখন সূর্য কুম্ভ রাশি ছেড়ে ধীরে ধীরে মীন রাশির দিকে অগ্রসর হয়। দুটি নক্ষত্রপুঞ্জের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই অব্যক্ত অন্তর্বর্তী মুহূর্ত যেন পৃথিবীকে তার কোমল আলিঙ্গনে মুড়ে দেয়। সূর্য তখনো কোমল, তবু একটু বেশি উজ্জ্বল লাগে; দিন দীর্ঘতর হয়; গিলে পাখির গান শোনা যায়; গাছপালার শাখায় নতুন কুঁড়ির উঁকি, ধীরে ধীরে জেগে ওঠে মা ধরিত্রী।
 
এমন সময়ে উৎসবের রঙিন কোলাজ আমাদের চারপাশে ফেটে পড়ে। শিবরাত্রি, লুনার নিউ ইয়ার, হোলি, নওরোজ, সবই প্রকৃতির শীত-বাসন্তী চক্র, অন্ধকার-আলো, বিশ্রাম-চাঞ্চল্যের নিত্যপরিবর্তনকে কৃতজ্ঞতাভরে স্বীকার করে। এ বছর আমি সুযোগ পেয়েছি ভারতে তুলনামূলক অচেনা কিন্তু অত্যন্ত প্রাণবন্ত এক রুশ উৎসব, মাসলেনিৎসা, উদযাপনে অংশ নেওয়ার।
মাসলেনিৎসা শব্দের আক্ষরিক অর্থ “মাখন-ক্রিমের মধুর সময়” এটি পূর্ব স্লাভিকদের প্রাচীন, প্রাগৈতিহাসিক লোকউৎসব, যা শীতের অবসান এবং বসন্তের আগমনের প্রতীক। রাশিয়ার কঠোর প্রকৃতিপ্রবণ জীবনযাত্রার সঙ্গে এই উৎসবের সম্পর্ক এত গভীর যে অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পরও এটি টিকে গেছে।
 
রাশিয়ার দীর্ঘ, হিমশীতল চার মাস- যেখানে সূর্য দেখা যায় অল্প, তার শেষে বসন্তের আগমন এবং সূর্যের উষ্ণতাকে যে কতখানি মূল্য দেওয়া হয়, মাসলেনিৎসা তার স্পষ্ট প্রমাণ। রঙ, সুর, হাসি আর জনসমাগমে সেদিন গ্রাম থেকে শহর, সবই রূপ নেয় প্রাণময় উৎসবে।
 
অর্থোডক্স চার্চ স্বীকৃত একমাত্র প্রাক-খ্রিস্টীয় উৎসবও এটি। গ্রেট লেন্ট শুরুর আগের সপ্তাহে, ইস্টারের সাত সপ্তাহ আগে, এই উল্লাস। কারণ লেন্টে যখন সঙ্গীত, নৃত্য, ভোজন ও সামাজিক উচ্ছ্বাস বন্ধ থাকে, তখন মাসলেনিৎসা হলো আনন্দের শেষ সুযোগ অন্তর্মুখী আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির আগে প্রাণখোলা উৎসব।
 
প্যানকেক দিয়ে গড়া লেডি মাসলেনিৎসা
 
কলকাতায় রুশ হাউস ও রুশ কনস্যুলেট মিলে এমনই এক আলোকোজ্জ্বল সন্ধ্যার আয়োজন করেছিল, যেখানে ভারতীয়রা উচ্ছ্বাসে অংশ নিয়েছিল। কাপড় ও খড় দিয়ে বানানো লেডি মাসলেনিৎসার প্রতিমা শিশুদের রঙিন ফিতের ছোঁয়ায় সাজানো হয়। সবাই একটি করে খড়-ফিতে বেঁধে চুপিচুপি কামনা জানায়, যে চিন্তা বা বোঝা তারা জীবনের বাইরে পাঠাতে চায়। এরপর শুরু হয় হাসি-আনন্দে ভরা বিকেল- গান, নাচ, এমনকি টাগ-অব-ওয়ার পর্যন্ত।
 
শেষে প্রতিমা দাহের সময়, যা উৎসবের মূল আকর্ষণ শীতের বিদায় ও বসন্তের সূচনার প্রতীক। রাশিয়ার বরফমাখা প্রান্তরে এই আগুনের উষ্ণতা কত অমূল্য তা কল্পনা করা যায়! অগ্নিশিখা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলে আমরা দেখলাম ফিতেগুলো পুড়ে বিলীন হচ্ছে, হয়তো আমাদের মনের পুরনো ক্লান্তি ও অনর্থকে সঙ্গে নিয়ে। শীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা স্বাগত জানালাম নববসন্তকে।
 
কলকাতায় রাশিয়ান কনস্যুলেটে লেডি মাসলেনিৎসার প্রতিমা
 
অন্য একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খাবার, বিশেষত প্যানকেক। এই কারণে মাসলেনিৎসা পরিচিত “প্যানকেক সপ্তাহ” নামেও। রুশ ভাষায় যাকে বলে ব্লিনি, সূর্যের মতো সোনালি, গোল, পাতলা প্যানকেক। পুরনো দিনে যেসব খামিরহীন রুটি বানানো হতো, পরে খামির আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় প্যানকেকের সৌর-প্রতীকে। মধু, সাওয়ার ক্রিম, ক্যাভিয়ার, জ্যাম- এ সব সহযোগে পরিবার-পরিজনের ভোজন উৎসব জমে ওঠে। রাস্তায় চলে খেলা, তুষারযুদ্ধ, স্লেজ রাইডের উত্তেজনা।
 
কলকাতাতেও ছিল সেই একই রসনাতৃপ্তি, অনেক রকম ঘরোয়া জ্যাম, রাশিয়া থেকে আনা সাওয়ার ক্রিম, বিখ্যাত রুশ সালাদ, আর নানা কেক-পেস্ট্রি, সবই রুশ ঐতিহ্যের ছোঁয়া নিয়ে ভারতের মাটিতে বন্ধুত্বের উষ্ণতা বাড়িয়ে তুলল।
 
এতে স্পষ্ট, বৈদিক আচারগুলোর সঙ্গে মিল কতখানি! ভারতীয়দের সূর্যোপাসনা প্রাচীন সভ্যতা থেকেই চলে আসছে। ‘সূর্য’ এবং ‘সল্‌ন্ৎসে’ উভয় শব্দের শিকড়ই ইন্দো-ইউরোপীয়। শীতের প্রতীকী দাহ দেখে মনে পড়ে গেল লোহরি ও হোলিকা দহন। উত্তর ভারতে পালিত লোহরি, স্থানীয় আবহাওয়ার কারণে তাড়াতাড়ি হয়, শীত বিদায় ও ফসল আগমনের বার্তা দেয়। অগ্নি প্রজ্বলন সূর্য আর আলোরই প্রতিরূপ।
 
মাসলেনিৎসার ভোজের আয়োজন
 
হোলিতে আবার বসন্তকে স্বাগত জানানোর আনন্দ, পুরোনো জীর্ণতাকে পুড়িয়ে ফেলে নতুন ঋতুর অঙ্গীকার। হোলিকার প্রতিমা পোড়ানোর সঙ্গে মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতারও মিল আছে। মাসলেনিৎসার প্রতিমা দহনেও যেন একই বার্তা। প্যানকেকেরও মিল, বাঙালির পাটিসাপটা। নরম ক্রেপের ভিতর ক্ষীর বা নারকেলের মিষ্টি পুর, এ সময়ই তো তারও উৎসব।
 
এই মিলগুলোই বুঝিয়ে দেয়, কেন ভারতীয়রা মাসলেনিৎসাকে এত দ্রুত আত্মীয় করে নিল। এটি রাশিয়া-ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক নিবিড়তার নিদর্শন। আমার কাছে মাসলেনিৎসা এক বিশ্বাসের প্রতীক, রাত্রি যতই দীর্ঘ ও অন্ধকার হোক, ভোরের সূর্য অবধারিত।