ইমান সাকিনা
রমজান রহমত, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাস। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুসলিমরা খাদ্য ও পানাহার থেকে বিরত থাকে, আত্মাকে পবিত্র করার ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে। এই পবিত্র সিয়ামের ভেতরে দুইটি মুহূর্ত বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: সেহরি ও ইফতার। বাহ্যিকভাবে এগুলো যেন শুধু দুটি খাবার, কিন্তু এর মাঝে লুকিয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও সামাজিক মূল্য।
সেহরির বরকত
সেহরি ভোরের আগে গ্রহণ করা খাবার। এটি দিনের প্রস্তুতি মাত্র নয়; এটি প্রিয় নবীর সুন্নত, যিনি বিশ্বাসীদের সেহরি করতে উৎসাহিত করেছেন, যদি তা এক চুমুক পানি হয়। ফজরের আগের সেই নিস্তব্ধ সময়ে উঠলে হৃদয়ে এক ভিন্ন রুহানি প্রশান্তি নেমে আসে। চারপাশ শান্ত, মনোযোগের বিচ্ছুরণ কম, আর মানুষের হৃদয় তার রবের কাছাকাছি অনুভব করে। সেহরি তখন কেবল শরীরকে পুষ্ট করার মুহূর্ত নয়, আত্মাকে জাগিয়ে তোলারও সময়। অনেকেই এই সময় দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত বা ক্ষমা প্রার্থনায় ব্যয় করেন, যা সেহরিকে একটি অন্তরঙ্গ ইবাদতে রূপান্তরিত করে।
শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেহরি শরীরকে দিনের দীর্ঘ উপবাসে শক্তি যোগায়। সুষম খাবার ধৈর্য, মনোযোগ ও ইতিবাচকতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। ইসলাম শরীর ও আত্মার ভারসাম্যপূর্ণ চাহিদাকে স্বীকৃতি দেয়, সেহরি সেই ভারসাম্যের সুন্দর প্রতিফলন। এ ছাড়াও সেহরি মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। ভোরে ওঠা দৃঢ় সংকল্প চায়। এটি মানুষকে আরামের উপরে উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিতে শেখায়, যা রমজানের অন্যতম শিক্ষা।
ইফতারের আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা
যেখানে সেহরি নীরব ভক্তির প্রতীক, সেখানে ইফতার আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হলে মুসলিমরা রোজা ভঙ্গ করে খেজুর ও পানি দিয়ে, নবীর অনুসৃত পথ ধরে।ইফতার আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের স্মারক। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার পর এক চুমুক পানি পর্যন্তও উপহার মনে হয়। এই অভিজ্ঞতা হৃদয়কে কোমল করে এবং অনাহারী মানুষের প্রতি সহানুভূতি বাড়ায়। এটি দানশীলতার অনুপ্রেরণা জাগায়।
আধ্যাত্মিকভাবে ইফতার মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মানুষ বিনয় নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তার দেয়া রিজিকের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। দিনের ক্ষুধা তখন কৃতজ্ঞতা ও আশার আলো হয়ে ওঠে।
ইফতার পরিবার ও সমাজে বন্ধন জোরদার করে। একসাথে খাবার ভাগাভাগি উষ্ণতা ও ঐক্য সৃষ্টি করে। মসজিদ, বাড়ি, সবখানেই দরজা খুলে যায় প্রতিবেশী, অতিথি ও অভাবী মানুষের জন্য। একই টেবিলে বসে সকল বৈষম্য ভুলে যাওয়া, এটাই রমজানের মহিমা। পৃথিবীর বহু স্থানে সম্মিলিত ইফতার দয়া, উদারতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দৈনন্দিন জীবনের ভারসাম্যের পাঠ
সেহরি ও ইফতার রমজানের প্রতিদিনকে সুন্দরভাবে ঘিরে রাখে। সেহরিতে থাকে নিয়ত ও আল্লাহর উপর ভরসা; ইফতারে থাকে কৃতজ্ঞতা ও স্মরণ। একটি নিভৃত ও ধ্যানমগ্ন; অন্যটি আনন্দময় ও মিলনমুখর। কিন্তু দুটোই ইবাদত, নিয়ত যদি হয় খাঁটি। এগুলো ধৈর্য, আত্মসংযম ও কৃতজ্ঞতা শেখায়। মনে করিয়ে দেয়, জীবনও আসলে প্রচেষ্টা ও প্রতিফল, কষ্ট ও স্বস্তির চক্র। যেমন দিনের ক্ষুধার পর ইফতারের প্রশান্তি আসে, তেমনি জীবনের কষ্টের পর আসে সহজ পথ, যারা ধৈর্য ধরে।
সেহরি ও ইফতারকে আরও অর্থবহ করতে
** সেহরিকে শুধু অভ্যাস নয়, সচেতন নিয়তের অংশ করুন।
** খাবারে পরিমিতি বজায় রাখুন, রমজান সংযমের মাস।
** ইফতারের পূর্বের মুহূর্তগুলো দোয়ায় ব্যয় করুন।
** সুযোগ পেলে অন্যকে ইফতারে শরিক করুন, বিশেষত অভাবীদের।
** উভয় খাবারে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ধরে রাখুন।
সেহরি ও ইফতার শুধু রোজার শুরু ও শেষ নয়, এগুলো মুমিনের দিনের বরকতময় বিরতি। এগুলো শরীরকে পোষণ করে, আত্মাকে উঁচু করে, সমাজকে একত্র করে। তাদের সরলতায় লুকিয়ে আছে গভীর জ্ঞান। এর মাধ্যমে রমজান শুধু খাদ্য থেকে বিরত থাকার নয়, আত্মজাগরণ, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর নৈকট্যের এক পবিত্র যাত্রা হয়ে ওঠে। আল্লাহ করুন, প্রতিটি সেহরি হোক বরকতময়, আর প্রতিটি ইফতার হোক আন্তরিক কৃতজ্ঞতায় ভরপুর।