বক্সিং রিংয়ে আত্মবিশ্বাসী পাঞ্চ: নিখাত থেকে কামার —ভারতের বক্সিংয়ে মুসলিম বক্সারদের অবদান

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 17 h ago
বক্সার নিখাত জারিন
বক্সার নিখাত জারিন

অনিকা মহেশ্বরী / নতুন দিল্লী

গত কয়েকদিনে ভারতের শীর্ষ বক্সার নিখাত জারিনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে তাকে তীব্র বক্সিং অনুশীলন করতে দেখা যাচ্ছে। ঘামে ভিজে যাওয়া শরীর, কেন্দ্রীভূত দৃষ্টি এবং প্রতিটি ঘাতই তার আত্মবিশ্বাসকে প্রকাশ করছে। এই ভিডিওটি কেবল তার ফিটনেস বা প্রশিক্ষণের বিষয় নয়, বরং নিখাত কিভাবে আগামি অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে, সেই প্রবল আবেগকেও ফুটিয়ে তুলেছে। এই দৃশ্য ভারতীয় বক্সিংয়ে মুসলিম খেলোয়াড়দের শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি সম্পর্কে একটি বড় বার্তাও প্রদান করেছে।

বক্সিং কেবল একটি খেলা নয়, এটি শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সাহস এবং অধ্যবসায়ের পরীক্ষা। পাশাপাশি এটি সেই সংগ্রামীদের কাহিনিও তুলে ধরে, যারা সীমিত সম্পদ, সামাজিক চাপ এবং আর্থিক অসুবিধার সত্ত্বেও হাল ছাড়তে অস্বীকার করে। ভারতের ক্রীড়া জগতে বক্সিং একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে এবং মুসলিম বক্সারদের অবদান কেবল গর্বের বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস।

আজ ভারত উন্নত ক্রীড়ায় এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছেযেখানে আন্তঃগাঁথনি, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা একত্রিত হচ্ছে। বিশাল স্টেডিয়াম, বিদেশি কোচ এবং আধুনিক সা-সুবিধা এখন এই ব্যবস্থার অংশ, তবুও বাস্তবে দেখা যায় যে বহু খেলোয়াড় এখনও কঠোর সংগ্রামের মুখোমুখি। এই সংগ্রামের সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় মহিলাদের বক্সিংয়ে, যেখানে নিখাত জারিন ভারতের মহিলা বক্সিংয়ের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।


নিখাত জারিন

তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলার সাধারণ একটি মুসলিম পরিবারের সন্তান নিখাতের বিশ্ব মঞ্চে যাত্রা সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তার বক্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল, তবে মহিলাদের বক্সিং সম্পর্কে সামাজিক মনোভাব, সম্পদের অভাব এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বারবার বিতর্ক তার পথে প্রধান বাধা সৃষ্টি করেছিলবহু দৃঢ় প্রদর্শনের পরও তাকে অবহেলা করা হয়েছিল, কিন্তু নিখাত কখনও পরিস্থিতি তার সংকল্পকে দুর্বল করতে দেননি।

বিশ্ব মহিলা বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে দুইটি স্বর্ণপদক অর্জন করা, কমনওয়েলথ গেমসে শীর্ষ পর্যায়ে প্রদর্শন করা এবং এশিয়ান পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করা কেবল পদকের তালিকা নয়, বরং এই সাফল্য নিখাতকে বর্তমান প্রজন্মের জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার মানসিক শক্তি প্রদর্শন করে। আজ তিনি হাজার হাজার মেয়ের জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যারা সামাজিক চাপের কারণে তাদের স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

নিখাতের কাহিনীও ধর্ম, পরিচয় এবং ক্রীড়ার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যায় তা প্রদর্শন করছে। বক্সিংয়ের মতো খেলায় সাজ-পোশাক এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, তবে নিখাত তার পারফরম্যান্সের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে ক্রীড়া শৃঙ্খলা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস বিরোধী নয়, বরং এগুলো সহাবস্থাপন করতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, যেখানে মহিলা খেলোয়াড়দের সমতা এবং সম্মানের জন্য লড়াই করতে হয়, তখন নিখাত জারিন ভারতীয় ক্রীড়া ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।


মহম্মদ হুছামুদ্দিন

পুরুষ বক্সিংয়ের কথা বললে তেলেঙ্গানার নলগোন্ডা জেলার সন্তান মহম্মদ হুছামুদ্দিন আজও ভারতের দলের অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য নাম হয়ে রয়েছেন। রেলওয়ে এবং সার্ভিসেস দলের হয়ে খেলার সময়ে তিনি নিয়মিতভাবে নিজের ফিটনেস এবং কৌশল উন্নত করেছেন। আন্তর্জাতিক বক্সিং ক্রমে দ্রুতগতিশীল এবং কারিগরি হয়ে উঠলেও, হুছামুদ্দিন একজন শান্ত, সংযত এবং কৌশলগত বক্সার হিসেবে পরিচিত।

এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক, কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ পদক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারতের জন্য বহু পদক অর্জন করা প্রমাণ করে যে, শৃঙ্খলা এবং নিয়মিত প্রচেষ্টা এখনও ভারতীয় বক্সিংয়ের মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে আছে। হুছামুদ্দিনের যাত্রা এই বার্তাই দেয় যে, অত্যাধুনিক সা-সুবিধার অভাবও কোনো খেলোয়াড়কে বাধা দিতে পারে না, যদি লক্ষ্য স্পষ্ট এবং পরিশ্রম কঠোর ও সততার সঙ্গে করা হয়।

ভারতের মুসলিম বক্সারদের উত্তরাধিকারের কথা বললে মণিপুরের মহম্মদ আলী কামারের নাম ঐতিহাসিকভাবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিশ্ব অ্যামেচার বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের হয়ে প্রথম পদক অর্জন করে দেশকে বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দারিদ্র্য, সীমিত সম্পদ এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর যাত্রা সহজ ছিল না, তবে কামার প্রমাণ করেছেন যে প্রতিভা কোনো পরিচয় বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।

কামার এশিয়ান গেমস, এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিশ্ব পর্যায়ের বিভিন্ন ইভেন্টে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং বর্তমানে তিনি একজন প্রশিক্ষক এবং পরামর্শদাতা হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন। যেখানে ভারতীয় মহিলা বক্সিং বিশ্ব পর্যায়ে নতুন সাফল্যের কাহিনী লিখছে, সেই সময়ে কামারের মতো খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষকের ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 মহম্মদ আলী কামার

নিখাত জারিন, মহম্মদ হুছামুদ্দিন এবং মহম্মদ আলী কামারের কাহিনী কেবল ব্যক্তিগত সফলতায় সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো আর্থিক দুর্দশা, সামাজিক পক্ষপাত, সুযোগের বৈষম্য এবং পরিচয়ের চ্যালেঞ্জসহ একটি সমষ্টিগত সংগ্রামের প্রতিফলন। প্রতিটি লড়াই, প্রতিটি ঘাত এবং প্রতিটি জয় বা পরাজয় এই খেলোয়াড়দের কেবল উন্নত ক্রীড়াবিদ হিসেবে নয়, সমাজের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও গড়ে তুলেছে।

অলিম্পিক ও বিশ্ব ক্রীড়া মঞ্চে আজ ভারত যখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, এই বক্সাররা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করছে যে কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং নিষ্ঠা যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে। নিখাত জারিন মহিলা বক্সিংয়ের নতুন পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করছেন, হুছামুদ্দিন পুরুষ বক্সিংয়ের স্থায়িত্ব এবং কৌশলকে প্রতিফলিত করছেন, এবং মহম্মদ আলী কামারের উত্তরাধিক্য ভবিষ্যপ্রজন্মের জন্য পথ প্রদর্শন করছে

২০২৬ সালের বক্সিং দিবসের দিনে ভারতীয় মুসলিম বক্সাররা কেবল দেশকে গর্বিত করেনি, এটি ক্রীড়া সমতার সর্বোত্তম মঞ্চও প্রমাণ করেছে। সীমিত সম্পদ হোক, সামাজিক চাপ হোক বা পরিচয় একটি চ্যালেঞ্জ হোক, যদি সংকল্প দৃঢ় হয়, তবে প্রতিটি ঘাত কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিস্থিতিকেও পরাস্ত করতে পারে। এটি হল ভারতীয় বক্সিংয়ের প্রকৃত বিজয়।