মেওয়াতের প্রথম নারী বিধায়ক: জাহিদা খানের নেতৃত্বের পথচলা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
মেওয়াতের প্রথম নারী বিধায়ক: জাহিদা খানের নেতৃত্বের পথচলা
মেওয়াতের প্রথম নারী বিধায়ক: জাহিদা খানের নেতৃত্বের পথচলা
 
ইউনুস আলভি / আলওয়ার (রাজস্থান)

রাজস্থানের আলওয়ার থেকে শুরু করে হরিয়ানার নুহ–পালওয়াল ও ফরিদাবাদ এবং উত্তরপ্রদেশের মথুরা–কোসি অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত মেওয়াত এলাকায় আজ যে নামটি অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে, তিনি হলেন জাহিদা খান। মেওয়াতের প্রথম নারী বিধায়ক হিসেবে তিনি আইন পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে তিনি শুধু মেওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, বরং রাজস্থানে মুসলিম রাজনীতিরও এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। আদালতের অঙ্গন থেকে বিধানসভা ও মন্ত্রিসভা পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা আজ রাজনৈতিক মহলেও স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলছে।
 
জাহিদা খানের রাজনৈতিক পথচলার একটি বিশেষ দিক হলো, তিনি এক সমৃদ্ধ সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মেওয়াত অঞ্চলের রাজনীতিতে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত জাগরণের ইতিহাসে কয়েকটি নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে- চৌধুরী মোহাম্মদ ইয়াসিন খান, চৌধুরী তায়্যাব হুসেন এবং জাহিদা খান। চার ভাইবোনের মধ্যে জাহিদা সবচেয়ে ছোট হলেও তাঁর পরিচয় গোটা অঞ্চলে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
 
জাহিদা খান
 
জাহিদা খানের জন্ম ৮ মার্চ ১৯৬৮ সালে। তিনি এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যার সঙ্গে মেওয়াতের সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর দাদু চৌধুরী মহম্মদ ইয়াসিন খান, যিনি মেওয়াতে 'বাবা-এ-কওম' নামে শ্রদ্ধেয়, ১৯২১ সালেই শিক্ষার আলো জ্বালানোর উদ্যোগ নেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রেইন মেও হাই স্কুল, যা পরে ইয়াসিন মেও ডিগ্রি কলেজ হিসেবে পরিচিত হয়। তাঁর স্বপ্ন ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মেও সম্প্রদায়কে জাতীয় মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা।
 
ইয়াসিন খান ১৯২৬ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড পাঞ্জাব লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন এবং পরে ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব বিধানসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার বিরল রেকর্ডও গড়েন। দেশভাগের সময় তিনি মেও সম্প্রদায়ের পাকিস্তানে চলে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাদের মনোবল বাড়াতে মহাত্মা গান্ধীকে মেওয়াতে আমন্ত্রণ জানান। এর ফলেই আজ মেও সম্প্রদায় ভারতের মাটিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
 
জাহিদার বাবা চৌধুরী তায়্যাব হুসেন ছিলেন এমন বিরল ভারতীয় রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি তিনটি রাজ্যে, পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানে-মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নুহ ও তাউরু অঞ্চল থেকে বিধায়ক ছিলেন, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন এবং শিক্ষা, সংখ্যালঘু অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের জোরালো সমর্থক ছিলেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্ব মেওয়াতকে সংগঠিত ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গের সাথে জাহিদা খান
 
জাহিদার দুই ভাই ও এক বড় বোন রয়েছে। তাঁর বড় ভাই জাকির হুসেন বর্তমানে হরিয়ানা ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রশাসক এবং এর আগে নুহ ও তাউরু অঞ্চল থেকে তিনবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। ছোট ভাই ফজল হুসেন রাজস্থানের তিজারা অঞ্চল থেকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁর বড় বোন একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং দুলাভাই একজন ইএনটি (ENT) বিশেষজ্ঞ। জাহিদা দিল্লির জেএমসি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন, পরে এমডিইউ রোহতক থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (LLB) সম্পন্ন করে দিল্লি হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি রাজস্থানের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
 
রাজনৈতিক জীবন ও সাফল্য
 
২০০০ সালে, যখন তাঁর বাবা চৌধুরী তায়্যাব হুসেন গেহলট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তখন পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কামা পঞ্চায়েত সমিতির আসনটি নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। স্থানীয় মানুষের সর্বসম্মত সমর্থনে জাহিদা খানকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তিনি সর্বসম্মত সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কামা পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন, যা আজও একটি রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
 
রাজনীতির শুরু থেকেই জাহিদা সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাকে। ২০০৮ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর তিনি কংগ্রেসের টিকিটে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়লাভ করে মেওয়াতের প্রথম নারী বিধায়ক হন। তিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত জনগণের সেবা করেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবারও জয়ী হন। এই সময়ে তিনি রাজস্থানের শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতি এবং প্রিন্টিং ও স্টেশনারি বিভাগের দায়িত্বও সামলান।
 
একটি সভায় জাহিদা খান
 
পারিবারিক সমর্থন
 
জাহিদা খানের স্বামী জালিস খান পেশায় একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও চাকরির বদলে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি প্রয়োজনে জাহিদার রাজনৈতিক কাজে সহায়তা করেন এবং পরিবারের দায়িত্বও সামলান। তিনি বলেন, “চৌধুরী তায়্যাব হুসেনের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবার এবং পুরো চৌধুরী পরিবারের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল যে কামা অঞ্চল থেকে জাহিদা খানকেই রাজনীতিতে আসতে হবে।”
 
জাহিদা খানের দুই সন্তান রয়েছে। তাঁর মেয়ে একজন চিকিৎসক এবং ছেলে সাজিদ খান এলএলবি (LLB) সম্পন্ন করেছেন। ২০২১ সালে সাজিদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাহাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান নির্বাচিত হন। তিনি পারিবারিক ব্যবসাও পরিচালনা করেন এবং রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করেন। পরিবারের পূর্ণ সমর্থন ও স্বাধীনতা পাওয়ার ফলে জাহিদা রাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে পেরেছেন। তাঁর কাজের ধরণ, দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা ও সততার কারণে অনেকেই তাঁর মধ্যে তাঁর বাবার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।
 
প্রাক্তন মন্ত্রী জাহিদা খান বলেন, “আজকের সময়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রেখে রাজনীতি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ১৫–২০ বছরে রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক বদলে গেছে এবং ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসতে দ্বিধা বোধ করছেন। রাজনীতি এখন শুধু সেবার মাধ্যম নয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ এটিকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
 
একটি সভায় বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে জাহিদা খান
 
মেওয়াতের ঐতিহ্য ও অবদান
 
মেওয়াতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে কয়েকটি পরিবারের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ছাড়া এই অঞ্চলের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। ইয়াসিন খানের শিক্ষার ওপর জোর, তায়্যাব হুসেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জাহিদা খানের নারী নেতৃত্ব, এই তিন প্রজন্মের ঐতিহ্য আজ মেওয়াতের পরিচয় হয়ে উঠেছে।
 
জাহিদা খান শুধু রাজনীতিই নয়, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এআইসিসি-র সদস্য, রাজস্থান পিসিসির পদাধিকারী এবং অল ইন্ডিয়া উইমেনস কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর ভাই জাকির হুসেন হরিয়ানা ও মেওয়াত অঞ্চলে তিনবার বিধায়ক হয়ে পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
 
সমাজ ও গণতন্ত্রের জন্য বার্তা
 
জাহিদা খানের রাজনৈতিক জীবন আমাদের শেখায় যে সমাজসেবা ও মানুষের কল্যাণই প্রকৃত রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। তাঁর নেতৃত্বে মেওয়াতের মানুষ শিক্ষা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এই পরিবার ক্ষমতার চেয়ে সেবা, পদমর্যাদার চেয়ে নীতি এবং রাজনীতির চেয়ে সমাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
 

মেওয়াতের পরিচয় শিক্ষা, রাজনীতি এবং নারীর নেতৃত্ব- এই তিনটি ক্ষেত্রেই তিন প্রজন্মের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার ফল। এটি কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং একটি অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণের ইতিহাস, যেখানে বহু দশক ধরে শিক্ষা, অধিকার ও আত্মসম্মানের জন্য সংগ্রাম চলেছে।
 
এই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে জাহিদা খান আধুনিক রাজনীতিতে নারী ও সমাজের জন্য নতুন পথ উন্মুক্ত করেছেন। আজকের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বোধের ঘাটতি অনুভূত হলেও জাহিদা খানের মতো নেতারা প্রমাণ করেন, নীতিবোধ ও সমাজসেবাই রাজনীতির প্রকৃত ভিত্তি হওয়া উচিত। তাঁর নেতৃত্ব ও অবদান মেওয়াতের জন্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।