ভোরের হাওয়া যেন সেদিন একটু বেশিই উৎসবের গন্ধে ভরা। শীতের কুয়াশা সরে গিয়ে যখন বসন্তের রোদ মাটিতে পড়ে সোনালি আভা ছড়ায়, চারদিকে তখন নতুন পাতার সবুজ, শিমুল–পলাশের লাল–কমলা, আর ছড়ায় নানা নাম জানা অজানা ফুলের রঙিন হাসি। প্রকৃতি নিজেই যখন রঙে রঙে সেজে ওঠে, মানুষই বা পিছিয়ে থাকে কেন? প্রকৃতির এই বসন্তোচ্ছ্বাসই যেন মানুষকে ডাকে রঙের উৎসবে মেতে উঠতে, আহ্বান জানায় আনন্দের নতুন ঋতুকে।
কোথাও শিশুরা গোপনে পিচকারি ভরছে, কোথাও বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা রোদে শুকোতে রেখেছেন গুলালের হাঁড়ি। আর রান্নাঘরে? সেখানে চলছে আরেক যুদ্ধ, দুধের ফোটায় ফোটায় উঠছে উৎসবের সুর, ঘৃতের কড়াইয়ে মচমচে হয়ে উঠছে প্রজন্মের স্মৃতি, আর মশলার ঘ্রাণ মিশে যাচ্ছে সকালের আলোয়। হোলির আসল উচ্ছ্বাস যেন এখানেই- রঙে সাজানো মুখ, আর খাবারে সাজানো মন। প্রতিটি রং যেমন আনন্দের কথা বলে, প্রতিটি পদও তেমনই খুলে দেয় এক একটি গল্প-যা একদিকে পুরনো দিনের স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন দিনের উদ্যাপন।
হোলিকা দহন এবং রাধা কৃষ্ণের রং খেলার এক প্রতীকী ছবি
হোলি আজ রংয়ের উচ্ছ্বাস আর সুস্বাদু খাবারের দুনিয়ায় যতই বিখ্যাত হোক, ভারতের কোনও উৎসবই শুধু আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়- প্রতিটির পেছনেই থাকে এক গভীর গল্প, এক বিশ্বাস, এক চিরন্তন বার্তা। হোলিরও ঠিক তেমনই এক কিংবদন্তি আছে। বলা হয়, অত্যাচারী হিরণ্যকশিপুর অহংকার ভেঙে দিতে ভয়াবহ আগুনেও অক্ষত থেকেছিলেন ভক্ত প্রহ্লাদ, আর সেই আগুনে দগ্ধ হয়েছিল হোলিকা। অন্যদিকে রয়েছে কৃষ্ণ–রাধার রঙ খেলায় ভরা মনোরম ব্রজের কাহিনি। এই দুই গল্প মিলেই হোলিকে করে তোলে জয়ের, প্রেমের ও আলোয় ফেরার উৎসব। আর এই প্রাচীন কাহিনিগুলোর মতোই খাবারও আজ এই উৎসবের এক অনিবার্য ভাষা,যা হোলির স্বাদকে খুলে দেয় আরেক নতুন রঙে।
হোলি উৎসব তার রঙের উচ্ছ্বাসের মতোই আরও বিশেষ হয়ে ওঠে এর খাবারের দৌলতে। গুজিয়া, মালপুয়া, ঠান্ডাই, দই–বড়া, রাবড়ি থেকে শুরু করে নোনতা খাবারের তালিকা-সকলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস, রীতি আর আঞ্চলিক পরিচয়। এই বৈচিত্র্যময় স্বাদের মাঝেই বোঝা যায়এ দেশটি- মূলত বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের মিলনে গড়া এক বিশাল অনুভূতির মানচিত্র। এখানকার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ নিজেদের রীতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতির আলোকে উৎসবকে সাজায় আলাদা ধরনে। তাই একই উৎসব হলেও ভিন্ন ভিন্ন শহর, গ্রাম কিংবা সম্প্রদায়ে তার রূপ বদলে যায়- কেউ মিষ্টির ভরাতে আনন্দ খুঁজে পায়, কেউ আবার ঝাল–নোনতার স্বাদে উচ্ছ্বাস খুঁজে নেয়। উৎসব তাই এখানে এক রং নয়, এক স্বাদ নয়-এটি হাজার রঙের মতোই হাজার স্বাদের এক মিলনমেলা।
উত্তরপ্রদেশের ব্রজভূমির হোলি উদযাপন এবং বিখ্যাত পানীয় ' ঠান্ডাই ' -এর একটি ছবি
হোলি বললেই প্রথমেই চোখে ভাসে উত্তর প্রদেশ–এর প্রাণকেন্দ্র ব্রজভূমি, যেখানে রঙ যেন শুধু খেলা নয়, ভক্তির স্পর্শে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক মহাকাব্যিক উৎসব। ব্রজ অঞ্চলে হোলির সময় রাধা–কৃষ্ণ ভক্তির মতোই খাবারেরও আলাদা মাহাত্ম্য দেখা যায়। বিশেষ রান্নাঘরে এই সময় তৈরির প্রধান আকর্ষণ গুজিয়া-খোয়া, বাদাম আর নারকেলের পুর দেওয়া খাস্তা মিষ্টি। সঙ্গে মালপুয়া, যা ঘি–তে ভাজা নরম–মোলায়েম পিঠের মতো, ডুবিয়ে রাখা হয় চিনির সিরায়। ঠান্ডাই এখানে শুধু পানীয় নয়-বাদাম, গোলাপজল, মশলা আর দুধের গাঢ় মিশ্রণে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী পানীয় উৎসবের প্রাণ। দই–বড়া, কচুরি, চনা মশলা ও আলুর তরকারির মতো নোনতা খাবারও ব্রজ হোলির উৎসবী টেবিলকে পূর্ণতা দেয়। সব মিলিয়ে ব্রজের হোলির খাবার উত্তর প্রদেশের সমৃদ্ধ খাদ্য–ঐতিহ্য এবং উৎসবের প্রাণোচ্ছলতাকে একসঙ্গে ধরে রাখে।
রাজস্থানের হোলি উদযাপনের এক দৃশ্য
রাজস্থানে হোলি মানেই রঙের সঙ্গে রাজকীয় ঐতিহ্যের মহোৎসব। রাজস্থানের প্রতিটি অঞ্চলে- মেওয়ার থেকে মারওয়ার হোলি পালিত হয় নিজস্ব আভিজাত্য আর খাদ্যসংস্কৃতির ঝলক নিয়ে। এখানে উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ গুন্জা বা গুঞ্জিয়া, যা খোয়া, মেওয়া ও নারকেল দিয়ে ভরা খাস্তা মিষ্টি। সঙ্গে থাকে রাজস্থানের বিখ্যাত দাল–বাটি–চুরমা, যা সাধারণত ঘি–ভেজা বাটির সঙ্গে মিষ্টি চুরমার রং ও স্বাদে উৎসবকে আরও উজ্জ্বল করে। মালপুয়া, ঘেভর ও মোহনথালের মতো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নও হোলির রঙে মিশে যায়। আবার নোনতা স্বাদের জন্য থাকে প্যাজ কচুরি, মাটন কারি ও কীরাবাঁটি- মরুপ্রদেশের রুক্ষ আবহাওয়ার মতোই মশলাদার। রাজস্থানের হোলি তাই শুধু রঙের নয়, রাজকীয় খাবারেরও এক অনন্য উদ্যাপন।
মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পুরণ পোলি’ এবং মিষ্টান্ন ‘শ্রীখণ্ড’
মহারাষ্ট্রে হোলি পরিচিত রংপঞ্চমী নামে, আর এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন কোঙ্কণি ও মারাঠা রীতির খাবারসম্ভার। এখানে হোলি এলেই বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় পুরণ পোলি-মসৃণ চানা ডাল, গুড় এবং এলাচের ঘ্রাণে ভরা নরম রুটির মতো এক চিরপরিচিত মিষ্টান্ন। পাশাপাশি থাকে শ্রীখণ্ড, বসুন্দি ও থালিপীঠের মতো ঐতিহ্যবাহী স্বাদ। অনেক জায়গায় রং খেলার পর পরিবেশন করা হয় ঠাণ্ডা পান্না- কাঁচা আম, গুড় ও জিরের মেশানো এক প্রশান্তিদায়ক পানীয়। শহরজুড়ে জ্বলে ওঠা হোলিকা দহন–এর আগুনের উষ্ণতা আর ঘরে তৈরি পুরণ পোলির মিষ্টি গন্ধ মহারাষ্ট্রের হোলিকে করে তোলে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
পাঞ্জাবের ‘হোলা মহল্লা’ উদযাপন এবং পাঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী খাবারের থালি, যেখানে থাকে ‘মকাশি রুটি’, ‘সরসোঁ কা সাগ’, লাস্সি এবং কিছু মিষ্টি
পাঞ্জাবে হোলির ছন্দ একটু আলাদা- এখানে উৎসবটি উদ্যাপিত হয় হোলা মহল্লা নামে, যা পাঞ্জাব–এর শিখ ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই উৎসব শুধু রং নয়, বীরত্ব, কসরত, ঘোড়সওয়ারি আর সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহন করে। পাঞ্জাবের মানুষ তাই উৎসবের মজা নেন হৃদয়ভরা খাবারের মাধ্যমে- মকাশি রুটি ও সরসোঁ কা সাগ, ছোলে ভাটুরে, লাস্সি, পিন্ডি ছোলে এবং গুরের লাড্ডুর মতো শক্তিশালী ও পুষ্টিকর পদ দিয়ে। লাবঙ্গ–জিরে–ঘৃতের ঘ্রাণে ভরপুর পাঞ্জাবি রান্না হোলা মহল্লার বর্ণ আর উদ্দীপনাকে আরও তীব্র করে তোলে। এখানে হোলির রং ছড়ায় সাহস, উদারতা এবং সুস্বাদের মিশেলে।
বাংলার ‘বসন্ত উৎসব’-এর ঝলক এবং নানা ধরনের ‘পিঠা’
বাংলার হোলি, অর্থাৎ দোলযাত্রা বা দোল পূর্ণিমা, যেখানে রঙের পাশাপাশি ভক্তি, সংগীত ও নান্দনিকতার আলাদা আবহ বিরাজ করে। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব দোলের মূল আকর্ষণ- রঙিন আবরনে সেজে ওঠা ছাত্রছাত্রীদের নৃত্য–গীত, আবিরে ঢেকে যাওয়া পথ, আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছন্দে পুরো প্রাঙ্গণ যেন এক শিল্পিত উৎসবে রূপ নেয়। বাংলার হোলির খাবারের টেবিলও সমান রঙিন- পাটিসাপটা, চিতই পিঠে , দুধ–চিড়া , রসগোল্লা, সন্দেশ, মালাইকারি জাতীয় মিষ্টি- বাঙালির উৎসবের থালা পূর্ণ করে। ছোলাভাজা ও চানাচুর, রঙ খেলার ফাঁকে ফাঁকে খাওয়ার জন্য আদর্শ নোনতা সঙ্গী। বাংলার খাবারে মিষ্টি ও নারকেলের মেলবন্ধন যেমন স্পষ্ট, তেমনি প্রতিটি পদ বহন করে ঘরোয়া ঐতিহ্য ও উৎসবের সহজ-সরল আনন্দ।
বারপেটা সত্রের ‘দোল যাত্রা’ এবং আসামের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘খার’ দিয়ে তৈরি তরকারি
অসমে হোলিকে বলা হয় দোল যাত্রা, আর এর সবচেয়ে বিখ্যাত কেন্দ্র বরপেটা সত্র- যেখানে ভক্তি, সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গে রঙ খেলায় মেতে ওঠে হাজার মানুষ। বরপেটার এই হোলি শান্ত, শুদ্ধ ও বৈষ্ণবীয় রীতির জন্য গোটা রাজ্যে বিশেষভাবে পরিচিত। অসমের হোলির খাবারও ঠিক ততটাই ঘরোয়া, বাড়িতে তৈরি পিঠা, নানা রকম লারু, ঘি–ভাজা চিঁড়া, দুধ–চিড়া ও পায়েস থাকে উৎসবের মূল আকর্ষণ। রঙ খেলার পর গরম খার, লাল ডিম ও আলু ভাজি, মাছ–ভাত বা মটর–দালের মতো সহজ কিন্তু তৃপ্তিকর পদেই মিলেমিশে ধরা দেয় অসমের নিজস্ব স্বাদ। রঙ, ভক্তি আর সরলতার এই মেলবন্ধনেই আসামের হোলি হয়ে ওঠে অনন্য।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হোলির খাবারের গল্প যেন এক অটুট সেতুবন্ধন। আগে উঠোনে বসে হাতে বানানো গুজিয়া–পিঠে, ঐতিহ্যবাহী পদ, আর আজ সেখানে রেস্তোরাঁর নতুন রেসিপি, ফিউশন মিষ্টান্ন কিংবা আলাদা আঞ্চলিক স্বাদের মেলবন্ধন যোগ করেছে নতুন রং। সময় পাল্টেছে, রেসিপি বদলেছে, তবু হোলির খাবারের আসল জাদু একই-একতার স্বাদ, মিলনের আমন্ত্রণ আর ঘরের ভালোবাসার উষ্ণতা।
রঙ মিলিয়ে যায়, কিন্তু হোলির খাবারের স্মৃতি থেকে যায়- মিষ্টির গন্ধে, ভাগ করে খাওয়ার আনন্দে, আর মানুষের মন ছুঁয়ে থাকা সেই আদরে। হোলি তাই শুধু রঙ নয়; এটি মানুষের গল্প, পরিবারের বন্ধন আর খাবারের মাধ্যমে ভাগাভাগি করা ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ। রঙের মতোই সেই ভালোবাসা থাকুক চিরস্থায়ী-প্রতি উৎসবে, প্রতি থালায়, প্রতি হাসিতে।