শ্রীলতা এম
ভাষাগত বৈচিত্র্য কি বিভ্রান্তি, না কি এক বিশাল সাংস্কৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে প্রতি ১০০ কিলোমিটার অন্তর ভাষা বদলে যায়? কিন্তু তামিলনাড়ুর ১৯ বছর বয়সি মাহমুদ আক্রামের কাছে এই প্রশ্নটি তেমন গুরুত্ব বহন করে না।
আক্রাম প্রায় ৪০০টি ভাষা পড়তে ও লিখতে পারেন, এবং এর মধ্যে ৪৬টি ভাষা বুঝতে সক্ষম। তিনি তামিল, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, চীনা, জাপানি ও কোরিয়ান, এই দশটি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইংরেজি বর্ণমালা এবং তামিল ভাষার ২৯৯টি বর্ণ রপ্ত করে ফেলেন। আট বছর বয়সে তিনি প্রায় ৫০টি ভাষায় পড়া, লেখা ও টাইপ করতে পারতেন।
এরপর একের পর এক বিশ্বরেকর্ড। দশ বছর বয়সে তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে ২০টি ভাষায় ভারতের জাতীয় সংগীত লিখে ফেলেন। বারো বছর বয়সে, মাত্র তিন মিনিটে তিনি একটি বাক্য অনুবাদ করেন এমন সংখ্যক ভাষায়, যা তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা আরও ৭০ জন ভাষাবিদের তুলনায় বেশি।
তামিলনাড়ুর বাইরে কর্মরত, ১৬টি ভাষায় দক্ষ এক বহুভাষী পিতার ঘরে জন্ম নেওয়া আকরাম শব্দ, লিপি ও ধ্বনির ভেতরেই বড় হয়ে উঠেছেন। তবু তিনি সাক্ষরতা ও বোধগম্যতার পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন। তিনি ‘আওয়াজ: দ্যা ভয়েস’-কে বলেন “আমি ৪০০টি ভাষায় পড়তে ও লিখতে পারি, কিন্তু বুঝি মাত্র ৪৬টি ভাষা,”।
ভাষা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁর কাছে ভাষা কেবল মানবীয় অনুভূতি বা স্মৃতির আধার নয়, ভাষা একটি মাধ্যম। চীন ও ভারতের তুলনা টেনে তিনি বলেন, দুই দেশই ভাষাগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে প্রায় একটি করে মহাদেশ। চীনের সর্বত্র ম্যান্ডারিন বাধ্যতামূলক হওয়ায় সেখানকার বহু আঞ্চলিক ভাষা বিলুপ্তির পথে। ভারতে যদি সব রাজ্যে একটি মাত্র ভাষা চালু করা হয়, তাহলেও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “এর সুবিধা হলো ঐক্য। কিন্তু অসুবিধা হলো, যদি সবাই হিন্দির মতো একটি ভাষাই শেখে, তবে বহু ভাষা হারিয়ে যাবে।” পরিশেষে তাঁর বক্তব্য, “ভাষার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই চিন্তাধারা, যার মাধ্যমে ভাষা প্রকাশ পায়, এবং সেই বক্তারা, যাঁরা ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখেন।”
বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি সর্বাধিক কথিত ভাষার মধ্যে হিন্দি অন্যতম, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যা এই ভাষা শেখার প্রাসঙ্গিকতা বোঝায়। ভাষা রক্ষা করা উচিত কি না, বা কীভাবে করা উচিত, এই বিতর্কে তিনি নিজেকে জড়ান না।
বছরের পর বছর ধরে ভাষা শেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ একটুও কমেনি। যেখানে অধিকাংশ মানুষ বছরকে মাসে ভাগ করে, সেখানে আক্রাম তাঁর সময় ভাগ করেন সপ্তাহে। প্রতিটি সপ্তাহ উৎসর্গিত থাকে একটি নির্দিষ্ট ভাষার জন্য। তিনি এই সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। যখন আমরা কথা বলছিলাম, তখন তাঁর জন্য সেটি ছিল “আরবি সপ্তাহ”।
সে সপ্তাহে তিনি তাঁর সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস আরবি ভাষায় সেট করেছিলেন। তিনি আরবিতে সংবাদ, চলচ্চিত্র, রিল ও শর্টস দেখতেন; আরবিতে পড়তেন ও লিখতেন। পরের সপ্তাহে আবার অন্য একটি ভাষার জন্য একই প্রক্রিয়া।
বিদেশে বন্ধুদের সঙ্গে মাহমুদ আক্রাম
সংস্কৃত শেখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ভালো শিক্ষাসামগ্রীর অভাবে তা ছেড়ে দেন। তিনি বলেন “শিক্ষকের কাছ থেকে শেখার প্রচলিত পদ্ধতিটি আমার কাছে খুব একঘেয়ে লাগে। আমি নিজে নিজে শিখতে পছন্দ করি,”। আরেকটি কারণ ছিল তাঁর ধারণা, সংস্কৃত একটি মৃত ভাষা। “আমি কোনো পণ্ডিত নই। আমি অতীতমুখী নই, আমি ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, আর সংস্কৃত ভবিষ্যতের জন্য নয়,” তাঁর স্পষ্ট মত।
প্রচলিত ভাষার সঙ্গে সংযোগ থাকার কারণে তিনি ল্যাটিন শেখার চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু একই কারণে সেটিও সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, তিনি যেসব ৪৬টি ভাষা বোঝেন, সেগুলোর প্রতিটিতে অন্তত B1 স্তরের সার্টিফিকেট অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছেন। বর্তমানে মাত্র কয়েকটি ভাষায়ই তিনি এই সনদ পেয়েছেন। “প্রথমে আমি সব ৪৬টি ভাষায় B1 স্তরে পৌঁছাতে চাই, তারপর আরও ভাষা শেখার চেষ্টা করব,” তিনি বলেন।
কেন তিনি ভাষা শেখার এই কঠিন পথে এগিয়ে চলেছেন এবং এতে তাঁর কী উপকার, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, “যখন আমরা কোনো মানুষের মাতৃভাষায় কথা বলি, তখন আমরা শুধু মস্তিষ্ক নয়, হৃদয়কেও স্পর্শ করি।” তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো বিদেশি ভারতে এসে তামিল ভাষায় কথা বলতে পারে, তবে তামিলনাড়ুর মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ অনেক বেশি ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে। এতে আমাদের ভাষাগত সংখ্যালঘুদের কাছেও পৌঁছানো সহজ হয়।”
এই আবেগের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে স্কুলজীবনে। শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোরতা তাঁর ভাষাপ্রীতির জন্য খুব কম জায়গা রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতে মুক্ত শিক্ষার পথ বেছে নেন এবং পরে অস্ট্রিয়ায় চার বছর কাটিয়ে নিজের পছন্দের ভাষা ও বিষয় অধ্যয়ন করেন। সেই সময়েই তিনি জার্মান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং-এর মাধ্যমে তিনি ম্যাট্রিক সম্পন্ন করেন।
আক্রামের বিশ্বাস, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও শৃঙ্খলা থাকলে ১০০ দিনের মধ্যেই যে কেউ একটি ভাষায় উচ্চ প্রারম্ভিক বা মধ্যম স্তরে পৌঁছাতে পারে। তাঁর পদ্ধতি সুসংগঠিত, প্রথম তিন সপ্তাহ নিবিড় অধ্যয়ন, তারপর ধাপে ধাপে পাঠ গ্রহণ, সোশ্যাল মিডিয়া শোনা, চলচ্চিত্র ও সংগীত, এবং শেষে সম্পূর্ণ নিমজ্জন, অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে কেবল সেই ভাষার ব্যবহার।
বর্তমানে চেন্নাইয়ে বসবাসকারী আকরাম একসঙ্গে তিনটি ডিগ্রি অর্জন করছেন, ইংল্যান্ডের একটি ওপেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞান, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি এবং আলাগাপ্পা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যানিমেশনে একটি ডিগ্রি। তিনি কেবল অ্যানিমেশনের ক্লাসে উপস্থিত থাকেন, বাকি দুই বিষয়ে শুধু পরীক্ষায় অংশ নেন।
তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য শিক্ষকতা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে বিদেশি ভাষা শেখানো। তিনি বলেন, “যদি আমি জার্মান ভাষায় কথা বলতে বলতে একজন জার্মানকে হিন্দি শেখাতে পারি, তাহলেই জ্ঞান সত্যিকার অর্থে নতুন দরজা খুলে দেয়।” তিনি তাঁর পিতার আক্রাম গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট-এ শিক্ষকতা করেন।
একজন বন্ধুর সঙ্গে মাহমুদ আক্রাম
একজন বিস্ময়কর শিশু হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। জানা যায়, দশ বছর বয়সে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বিদ্যালয় তাঁকে অতিথি শিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
ভারতে মুসলমান হিসেবে বড় হওয়া আকরামের মন্তব্য সংযত ও সংবেদনশীল। তিনি বলেন, এক দশক আগে রাষ্ট্রীয় সমর্থন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। পড়াশোনায় সমস্যা হলে কেউ শুনত না, সাহায্য করত না। বিস্তারিত না গিয়ে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “এখন পরিস্থিতি বদলেছে।”
আজ তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, নতুন নতুন ভাষা শেখার পাশাপাশি তিরুক্কুরালকে বহু ভাষায় অনুবাদ করা, যাকে তিনি মানুষের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছানোর পথ বলে মনে করেন। বিদায়ের সময় তিনি আমাদের কয়েকটি আরবি শব্দ শিখিয়ে দেন, মারহাবা (হ্যালো), শুকরান (ধন্যবাদ), কাইফ আল-হাল? (কেমন আছেন?) এবং আলহামদুলিল্লাহ (আল্লাহর কৃপায় সব ভালো)।