ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে কলমের জয়, ‘ইনুচি গোষ্ঠা’য় রাজ্য পুরস্কার ইউনুস সৈয়দের

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
ইউনুস সৈয়দ তাঁর 'ইনুচি গোষ্ঠা' বইয়ের জন্য পুরষ্কার গ্রহণের মুহূর্তে
ইউনুস সৈয়দ তাঁর 'ইনুচি গোষ্ঠা' বইয়ের জন্য পুরষ্কার গ্রহণের মুহূর্তে
 
 
ভক্তি চালক / পুনে

মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে এ বছরের মর্যাদাপূর্ণ লক্ষ্মীবাই তিলক পুরস্কার অর্জন করেছে “ইনুচি গোষ্ঠা” (The Story Of Inu)) বইটি। তরুণ লেখক ইউনুস সৈয়দ তাঁর জীবনের কঠিনতম সময়, ক্যান্সারসহ একাধিক গুরুতর রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা, এই বইয়ে তুলে ধরেছেন। অসুস্থতার সঙ্গে সেই দীর্ঘ সংগ্রাম এবং সেই অভিজ্ঞতাকে সমাজের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান প্রদান করা হয়েছে।
 
ইউনুস সৈয়দ তখন পুনের ফার্গুসন কলেজে মাস্টার্স করছিলেন, যখন হঠাৎ তাঁর শরীরে ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার। পরবর্তী এক বছর তাঁকে মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। সেই সময়ে তাঁকে একসঙ্গে ১৩টি ভিন্ন রোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। দু’বার তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয়ে পড়েছিল যে আশা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। আইসিইউতে তাঁকে দেখে অনেক বন্ধুই মনে করেছিলেন, এটাই হয়তো তাঁদের শেষ দেখা।
 
 
কিন্তু আজ ইউনুস মৃত্যুকে হারিয়ে হাজার হাজার রোগীর কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখা বই “ইনুচি গোষ্ঠা” মূলত তাঁর সেই কঠিন রোগযুদ্ধেরই গল্প।
 
পুরস্কার গ্রহণের পর আনন্দিত ইউনুস সৈয়দ ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-কে বলেন, “যখন পুরস্কারের ঘোষণা হয়, তখন আমি কোকণ অঞ্চলে সিন্ধুদুর্গ, রত্নাগিরি এবং রায়গড় জেলায়, ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে কাজ করছিলাম। একটি জায়গায় আমি মেডিক্যাল অফিসার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার এবং ক্যান্সার রোগীদের পরিচর্যা নিয়ে একটি সেশন নিচ্ছিলাম। মজার বিষয় হলো, আমি তখন লক্ষ্মীবাই তিলকের গ্রামের খুব কাছের একটি গ্রামেই ছিলাম, আর পুরস্কারটিও তাঁর নামেই। এটা সত্যিই এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা, আমি ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে কাজ করছিলাম, আর আমার বইয়ের বিষয়ও ঠিক সেটাই।”
 
ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় ইউনুসকে বহু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সাধারণ রোগীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না, যেমন চিকিৎসার খরচ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, কেমোথেরাপির সময় কী কী সতর্কতা দরকার, কিংবা বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে পানি পান করা উচিত। এসব বিষয় অনেক সময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শেখা যায়।
 
ইউনুস বলেন, “আমি নিজেই আমার সব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছি। পরে মনে হলো, আমার এই অভিজ্ঞতা যদি অন্য রোগীদের উপকারে আসে, তাই আমি একটি ডায়েরি লেখা শুরু করি।” এই ডায়েরিই পরে একটি বইয়ে রূপ নেয়। ইউনুসের ডাকনাম ‘ইনু’ হওয়ায় বইটির নাম রাখা হয় “ইনুচি গোষ্ঠা” এবং এর ট্যাগলাইন ছিল, “আজুন মি জিভন্ত আহে” (আমি এখনও বেঁচে আছি)।
 
ইউনুসের মা কখনো তাঁর গ্রামের বাইরে পৃথিবী দেখেননি, যতদিন না তাঁর ছেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি মুম্বাইয়ের একটি বস্তি এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতেন। ইউনুস বলেন, “আমার সংগ্রামের চেয়েও বড় ছিল আমার মায়ের সংগ্রাম। তিনি মুম্বাইয়ের প্রচণ্ড গরম, অপরিচিত পরিবেশ এবং আমার অসুস্থতার কারণে হওয়া অবিরাম শারীরিক কষ্ট, সবকিছু সহ্য করেছেন পুরো এক বছর।” ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় যখন তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন ইউনুস তাঁর শৈশবের স্মৃতিগুলোও ডায়েরিতে লিখে রাখতেন।
 
ইউনুস সৈয়দ তাঁর পরিবারের সঙ্গে
 
“ইনুচি গোষ্ঠা” বইটি শুধু ক্যান্সার রোগীদের জন্য নয়। এক বছরে ১৩টি রোগের সঙ্গে লড়ে বেঁচে যাওয়া এক তরুণের গল্প সাধারণ মানুষকেও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করছে। মহারাষ্ট্র রাজ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি পর্ষদ ৮০টি বইয়ের মধ্যে থেকে এই বইটিকে নির্বাচিত করেছে।
 
মাত্র ২৬ বছর বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক সাহিত্যের আত্মজীবনী বিভাগে রাজ্য পুরস্কার পাওয়ায় ইউনুস এই বছরের সবচেয়ে কমবয়সী সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লেখালেখির প্রতি আগে তাঁর বিশেষ কোনো ঝোঁকই ছিল না; কেবল নিজের অভিজ্ঞতার শক্তিতেই তিনি এই সাফল্য অর্জন করেছেন।
 
ইউনুস বলেন, “আমার বইটি ২০২৪ সালের শেষে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর এটি 'পুনে বুক ফেস্টিভ্যাল' থেকে ‘নব লেখক’ পুরস্কার পায়। এরপর অনেক ক্যান্সার রোগী বইটি পড়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত বছর ক্যান্সার দিবসে আমাকে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যে হাসপাতালে আমার চিকিৎসা হয়েছিল। সেখানেই বইটির একটি অনানুষ্ঠানিক প্রকাশও হয়।”
 
ইউনুস ‘আরম্ভ’ নামে একটি এনজিওও প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কথায়, “ক্যান্সার মানেই জীবন শেষ, এমন ভাবা ভুল। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো অনেক উন্নত চিকিৎসা রয়েছে।”
 
তিনি টাটা হাসপাতালে চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিয়ে একটি ভিডিওও তৈরি করেছিলেন, যা হাজার হাজার মানুষ দেখেছেন। তাঁদের অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, এবং ইউনুস প্রায় ২,৫০০ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে সহায়তা করেছেন। আজ তাঁর কথায়, তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।