শ্রীলতা এম
২০২২ সালের তামিলনাড়ু কাউন্সিল নির্বাচনে চেন্নাই কর্পোরেশনে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (IUML)-এর একমাত্র বিজয়ী হিসেবে উঠে আসেন ফাতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ। সেই নির্বাচনে গোটা রাজ্য জুড়ে জয়ী হওয়া মাত্র ছয়জন মুসলিম নারী কাউন্সিলরের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম, যা তাঁকে বিশেষভাবে আলোকিত করে তোলে। তবে এই সাফল্য অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফাতিমার জন্য রাজনীতি নতুন কিছু নয়, যদিও নির্বাচনে লড়াই করার সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ তাঁর নিজের।
তাঁর পিতা এ কে আবদুল সামুদ IUML-এর প্রাক্তন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি ভেলুর কেন্দ্র থেকে দু’বার লোকসভা এবং দু’বার রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন। কন্যা ফাতিমা স্মরণ করেন, “তিনি প্রথমে হারবার কনস্টিটুয়েন্সি থেকে কাউন্সিলর হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি ছিলেন এক প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষ। পরিবারে আমরা সবাই তাঁকে অনুসরণ করতাম এবং তাঁর আদর্শ থেকেই অনুপ্রেরণা পেতাম।”
একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা প্রদানের মুহূর্তে ফতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ
ফাতিমার ঠাকুরদাও ছিলেন একজন মৌলানা, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তামিলনাড়ুর খিলাফত আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তিনিই প্রথমবারের মতো কোরআনের তামিল অনুবাদ করেন। “সেই সময়ে এই কাজ ঘিরে যথেষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছিল,” বলেন ফাতিমা। “কিন্তু দাদুর বিশ্বাস ছিল, ধর্মগ্রন্থ সাধারণ মানুষের বোধগম্য হওয়া দরকার।”
তিনি জানান, এই তামিল অনুবাদই ছিল কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর, যা আজও বহু মানুষ পাঠ করেন। “অনেক মাওলানা মনে করতেন কোরআন কেবল তার মূল ভাষাতেই থাকা উচিত। কিন্তু দাদু সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছিলেন, যদি তামিলে না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে তা পড়বে?” এই মহৎ কাজ সম্পূর্ণ করতে তাঁর দাদুর লেগেছিল দীর্ঘ ২৬ বছর।
রাজনীতির সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে (যাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ) একমাত্র ফাতিমাই এই পথে এগোন। তিনি পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ। “আমাদের বড় হওয়ার সময় কোনো ধরনের বৈষম্য ছিল না,” বলেন ফাতিমা। “বাবা-মা আমাদের সবাইকে সমানভাবে দেখেছেন, ছেলে-মেয়ের ভেদাভেদ করেননি। স্কুলে আমি বক্তৃতায় পারদর্শী ছিলাম এবং সমাজকর্মে যুক্ত ছিলাম। কলেজে ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব থেকে IUML-এর মহিলা শাখার নেতৃত্বে আসাটা ছিল স্বাভাবিক এক অগ্রগতি।”
তামিলনাডুর হাজ সার্ভিস সোসাইটি চেন্নাইতে ফাতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ
২০২২ সালে চেন্নাই কর্পোরেশনের নির্বাচনে তিনি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন এবং একমাত্র IUML কাউন্সিলর হিসেবে নজির গড়েন। বর্তমানে তিনি চেন্নাই কর্পোরেশনের শিক্ষা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য। একই সঙ্গে তৃতীয় মেয়াদের জন্য ওয়াকফ বোর্ড ও হাজ কমিটিতে মনোনীত হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের (AIMPLB) নির্বাহী কমিটির সদস্য।
৪০ সদস্যের এই কমিটিতে নারী সদস্য মাত্র ছয়জন। তামিলনাড়ু থেকে আছেন ফাতিমা এবং আরও একজন নারী। “এই মঞ্চে আমি আমার রাজ্যের নারীদের ভাবনা ও মতামত তুলে ধরতে পারি, বিশেষ করে যখন ব্যক্তিগত আইন সংক্রান্ত বিষয় আলোচনায় আসে,” বলেন তিনি।
সমাজে ক্রমশ বাড়তে থাকা বিভাজন তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে মেরুকরণের মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়া উসকে দেওয়া হচ্ছে। IUML ধর্মনিরপেক্ষতার পথে চলার চেষ্টা করে, কিন্তু নতুন প্রজন্ম ভয়ের আবহে বেড়ে উঠছে, এটাই তাঁর গভীর আশঙ্কা।
একটি অনুষ্ঠানে ফতিমা মুজাফ্ফর আহমেদ
কেরালার প্রখ্যাত লেখক ও IUML-এর সর্বোচ্চ নেতা সাদিক আলি থানগাল তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে দেখেন। থানগালের লেখা Bridging Communities Building Democracies বইটি তাঁর চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ফাতিমার মতে, বর্তমানে তামিলনাড়ুতেই মুসলমানরা সবচেয়ে নিরাপদ। “এখানে দ্রাবিড় মডেল কার্যকর, যেখানে নাগরিকদের হিন্দু বা মুসলিম হিসেবে নয়, তামিলের সন্তান হিসেবে দেখা হয়।” এই ঐক্যই তামিলনাড়ুকে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে রেখেছে বলে তাঁর বিশ্বাস। তিনি উল্লেখ করেন, রাজ্যের মাথাপিছু আয় দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং তামিলনাড়ু ধীরে ধীরে ট্রিলিয়ন-ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে চলেছে।
তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য সমাজোন্নয়ন, বিশেষ করে অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া, নিরক্ষর ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের ক্ষমতায়ন। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাও তাঁর স্বপ্নের অংশ। কাউন্সিলর হিসেবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি সব সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন। তাঁর কথায়, “দারিদ্র্যের কোনো ধর্ম নেই।”
সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন, মাদার টেরেসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে সম্মানসূচক ডক্টরেট এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি সক্রিয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ২৫টি দেশ সফর করেছেন। সাম্প্রতিকতম সফর ছিল আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সামিট অব উইমেনে অংশগ্রহণ। এর আগে চেন্নাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেটের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে তিনি সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন।
নিজের রাজনৈতিক স্বপ্ন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ফাতিমা সংক্ষেপে বলেন, “আমি আমার রাজ্যের উন্নয়নের গল্পের অংশ হতে চাই।”