ভারতের ‘কোচিং’ মহানগরীতে রমজান বয়ে আনছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 16 h ago
ভারতের ‘কোচিং’ মহানগরীতে রমজান বয়ে আনছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
ভারতের ‘কোচিং’ মহানগরীতে রমজান বয়ে আনছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
 
মালিক আসগর হাশমি / নতুন দিল্লি

 ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না, বরং একত্রিত করে। যখন সমগ্র বিশ্বে দূরত্ব বাড়ছে, ঠিক সেই সময় রাজস্থানের কোটা শহর এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে, যা পড়ে প্রত্যেক ভারতীয়ের বুক গর্বে ভরে উঠবে। রাজস্থানের এই ‘কোচিং নগরী’ শুধু ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারই তৈরি করেনি, বরং মানবতার এমন এক পাঠ শিখিয়েছে যা যেকোনো ডিগ্রির চেয়েও বড়। রমজানের পবিত্র মাসে এখানকার রাস্তায় রাতের নীরবতার মধ্যে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনি।

কোটার বিজ্ঞান নগরের গলিতে যখন পৃথিবী গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকে, তখন বিনোদ কুমার ও তাঁর দলের জন্য দিনের শুরু হয়। রাত ঠিক দশটা বাজতেই একটি বিশাল রান্নাঘরে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। চুলা জ্বলে ওঠে, বাসনপত্রের শব্দ শোনা যায় এবং বাতাসে তাজা খাবারের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রস্তুতি কোনো বড় উৎসবের জন্য নয়, বরং সেই শত শত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ‘সেহরি’ (রোজার পূর্বাহ্নভোজন) তৈরি করার উদ্দেশ্যে, যারা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে এখানে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে এসেছে।

এই সমগ্র উদ্যোগের কথা এস জেড কাদির খান তাঁর ব্লগের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যা সামাজিক মাধ্যমে বহু মানুষের হৃদয় জয় করেছে। কোটা কোচিং প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতির জন্য আসে। তাদের পড়াশোনার চাপ এতটাই বেশি যে তারা দিন-রাত বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকে। রমজানের দিনগুলোতে, যখন ইবাদত ও কঠোর রোজা পালনের সময় চলে, তখন সময়মতো পুষ্টিকর সেহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেই শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা পিজি বা হোস্টেলে থাকে, যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত রান্নাঘরের সুবিধা থাকে না। 

এমন পরিস্থিতিতে বিনোদ কুমারের নেতৃত্বে ‘মুহিম’ নামে একটি সংস্থা যেন দেবদূতের মতো আত্মপ্রকাশ করেছে। বিজ্ঞান নগরে অবস্থিত এই সংস্থাটির দুটি হোস্টেল রয়েছে, যেখানে ছেলে ও মেয়েরা পড়াশোনা করে। রমজান শুরু হতেই ‘মুহিম’-এর হেল্প ডেস্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিনোদ কুমারের দলে শুধু কর্মচারীরাই নন, শহরের বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও যুক্ত আছেন। এরা সকলেই নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ভুলে রাত সাড়ে দশটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেন।

রমজানের সেহরি প্রস্তুতের এক দৃশ্য

সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং আনন্দের বিষয় হলো, এই রান্নাঘরে প্রস্তুত করা খাবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য সেহরি প্রস্তুত করা হয়। আর্থিক দিক থেকে দেখলে, একটি সেহরির প্যাকেট প্রস্তুত করতে প্রায় ৪০ টাকা খরচ হয়। সেই হিসেবে বিনোদ কুমারের দল প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করছে, কিন্তু কোনো ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে একটি পয়সাও নেওয়া হয় না। এই সমস্ত ব্যয় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং দলের নিজস্ব প্রচেষ্টায় বহন করা হয়।

 যখন খাবার প্রস্তুত হয়ে যায়, তখন তা থ্রি-হুইলার (অটো)-এ তুলে শহরের সেইসব এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী বাস করে। রাতের অন্ধকারে যখন এই গাড়িগুলো পৌঁছে যায়, তখন ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের পাত্র নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং তাদের অত্যন্ত স্নেহভরে সেহরির সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এই দৃশ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করার এক প্রতীক।

এস জেড কাদির খান জানিয়েছেন, এই সৎ উদ্যোগের পরিসর কেবল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানবতার এই অভিযান ধর্মের সীমারেখা সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করেছে। যদি রাতে কিছু সেহরির প্যাকেট অবশিষ্ট থেকে যায়, তাহলে সেগুলো ফেলে দেওয়া বা সংরক্ষণ করার পরিবর্তে দলের সদস্যরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। কোনো ধরনের ধর্মীয় বৈষম্য ছাড়াই তারা ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা আশ্রয়হীন মানুষ, হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষারত রোগীর আত্মীয়স্বজন এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে সেই খাবার বিতরণ করেন।

‘মুহিম’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছর ধরে এই মহৎ কাজ করে আসছে এবং এখন এর প্রভাব আশেপাশের শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজ এমন অবস্থা হয়েছে যে কোটার পার্শ্ববর্তী শহরের মানুষও এই পুণ্যকর্মের অংশীদার হতে স্বেচ্ছায় কোটা আসেন। কেউ সবজি কাটায় সাহায্য করেন, আবার কেউ খাবার প্যাকেট তৈরিতে হাত লাগান।

রমজানের এই সেহরি শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং এটি সেই ভারতবর্ষের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বিনোদ ও কাদির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একে অপরের সুখ ও প্রয়োজনের যত্ন নেন। কোটার এই কাহিনি আমাদের শেখায় যে যখন উদ্দেশ্য সৎ হয় এবং হৃদয়ে মানবতার প্রতি সম্মান থাকে, তখন আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে কোনো শিশুকে যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং কোনো স্বপ্ন যেন অপূর্ণ থেকে না যায়।

কোটার এই ‘সেহরি’ আজ সমগ্র দেশের জন্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও নিঃস্বার্থ সেবার এক মহান বার্তা হয়ে উঠেছে। বিনোদ কুমার ও তাঁর দলের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে মানবতার ধর্মই সর্বোচ্চ ধর্ম।