দারাখশান আন্দ্রাবি: কাশ্মীরের হুমকি ও অস্থিরতার মাঝে এক নির্ভীক জাতীয় কণ্ঠস্বর

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 22 h ago
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
এহসান ফাজিলি / শ্রীনগর

“রাজনৈতিক জীবনে আমি দেশকে শক্তভাবে সমর্থন করেছি, কাশ্মীরে হুমকি কখনোই আমাকে থামাতে পারেনি”, এভাবেই নিজের অদম্য অবস্থানকে ব্যাখ্যা করেন ড. দারাখশান আন্দ্রাবি, যিনি বিজেপির জাতীয় নির্বাহী সদস্য এবং গত চার বছর ধরে জম্মু–কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডের একমাত্র নারী চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই নেত্রী ২০২২ সালের ১৬ মার্চ ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়ারপারসন (রাষ্ট্রমন্ত্রীর মর্যাদা) নিযুক্ত হওয়ার পর সত্যিকারের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে এটি ছিল প্রথম বড় নিয়োগ, যখন জম্মু–কাশ্মীর রাজ্য বিভক্ত হয়ে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত হয়: জম্মু–কাশ্মীর ও লাদাখ।
 

ড. সৈয়দ দারাখশান আন্দ্রাবি বিজেপির জাতীয় নির্বাহী সদস্য এবং জম্মু–কাশ্মীরের কোর গ্রুপের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন, কাশ্মীর উপত্যকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে উঠে আসা একমাত্র নেতা হিসেবে। তিনি বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র, রাজ্য সম্পাদক এবং ভাইস–প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। বিজেপিতে যোগদানের আগে তিনি জম্মু–কাশ্মীরে "সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টি" নামের একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিতেন, যারা বছরের পর বছর বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
 
রাজনীতি ও সমাজসেবার পাশাপাশি দারাখশান আন্দ্রাবি একজন কবি, লেখক, সমালোচক ও গবেষক হিসেবেও পরিচিত। কাশ্মীরি ও উর্দু ভাষায় কবিতা, ছোটগল্প, সমালোচনামূলক রচনা ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ তিনি লিখে থাকেন। সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে “অদ্বিতীয় লেখক” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন শিল্প–সমালোচকরা। ভারতের বহু সম্মানিত পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর কলাম প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উর্দুতে এম.এ ও বি.এড এবং অমৃতসরের গুরু নানক দেব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উর্দুতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
 
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
 
ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি “দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অব্যবস্থাপনায় অসুস্থ হয়ে পড়া” এই প্রতিষ্ঠানকে বদলে দেন। আগে এটি মুসলিম আওকাফ ট্রাস্ট নামে পরিচিত ছিল, যা রাজ্যের মসজিদ ও দরগাহগুলোর দেখভাল করত। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০০৩ সালে এটি জম্মু–কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডে রূপান্তর করেন।
 
ড. আন্দ্রাবি বলেন, “আমি এক বছরের মধ্যেই এটিকে স্বনির্ভর সংস্থায় পরিণত করি এবং মাজার-মসজিদের উন্নয়নের কাজ শুরু করি। বিশাল হুমকি ও তথাকথিত রাজনৈতিক বংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও আমি সংস্কারের কাজ চালিয়ে গেছি। এখন সব ওয়াক্ফ সম্পত্তি ডিজিটাল রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত। কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, নতুন বিভাগ ও সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী সংসদে এই কাজের প্রশংসা করেছেন এবং জম্মু–কাশ্মীর ওয়াক্ফ বোর্ডকে দেশের জন্য ‘রোল মডেল’ বলেছেন। উন্নয়নমূলক কাজ এখনো দ্রুতগতিতে চলছে।”
 
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
 
বর্তমান দায়িত্বে আসার আগে তিনি কাশ্মীরে শান্তি ও সামাজিক অবস্থার ওপর বহু ঐতিহাসিক কর্মসূচি, সেমিনার ও সমাবেশের আয়োজন করেন। তাঁর পরিচালিত “ভোট ফর ইন্ডিয়া” ও “রেফারেন্ডাম ফর পিস”, এই দুটি ঐতিহাসিক গণ–অভিযান জম্মু–কাশ্মীরের মানুষের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আনে এবং উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচারকে উন্মোচিত করে। কঠিন সন্ত্রাসের সময় তিনি ছিলেন “ইন্ডিয়ার ভয়েস”; মূলধারার রাজনৈতিক নেতাদের তোষণমূলক অবস্থানের বিরুদ্ধে তিনি স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছেন।
 
তিনি বরাবর সমাজসেবায় নিযুক্ত থেকেছেন, অশান্ত কাশ্মীরে শান্তির প্রচার, সন্ত্রাস–আক্রান্ত পরিবারদের আর্থিক সহায়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। গত দশকে দুর্নীতিবিরোধী তাঁর আন্দোলনকে রাজ্য ও দেশের বহু সংগঠন সমর্থন করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও কল্যাণমূলক বহু কর্মসূচিরও তিনি সূত্রপাত করেছেন, যেখানে উপত্যকার নারীরা দীর্ঘদিন সন্ত্রাসের কারণে ভীষণভাবে ভুক্তভোগী।
 
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
 
তিনি "ওয়াক্ফ ডেভেলপমেন্ট কমিটি" (সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রক)-র চেয়ারপারসন, কেন্দ্রীয় ওয়াক্ফ পরিষদের সদস্য, শিক্ষা ও নারী–কল্যাণ কমিটির চেয়ারপারসন এবং 'মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল সোসাইটি ফর এডুকেশন’-এর সদস্যসহ বহু সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি জম্মু–কাশ্মীর রাজ্যের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা বোর্ডেও সদস্য ছিলেন।
 
কাশ্মীরি, উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় সাবলীল ড. দারাখশান আন্দ্রাবি কবিতা, ছোটগল্প, সমালোচনা, গবেষণা, অনুবাদ ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, উর্দুতে "দিল হি কাফির হয়ে গয়া" এবং কাশ্মীরিতে "আহসাসান হিন্দে শীশে খাবে" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমালোচনা ও অনুবাদমূলক আরও পাঁচটি বই এবং বিভিন্ন ভাষায় প্রায় দুই ডজন গবেষণা–প্রবন্ধ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসম্ভারের অন্তর্ভুক্ত।
 
ড. দারাখশান আন্দ্রাবি
 
তিনি ‘শিরাজা’ জম্মু–কাশ্মীর আর্ট, "কালচার অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাকাডেমি"-র দ্বিমাসিক উর্দু পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন এবং সাহিত্য সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা তৈরি করেছেন। এছাড়া ‘দ্য থার্ড আই’ দৈনিক পত্রিকার সম্মানসূচক নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ বহু স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।
 
সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার লাভ করেছেন, ২০১৮ সালে রাজ্য সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৬ সালে জম্মু–কাশ্মীর আর্ট, কালচার অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যাকাডেমির অনুবাদ পুরস্কার তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।