শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
পরশ ডোগরার নেতৃত্বে জম্মু কাশ্মীর প্রথম রঞ্জি ট্রফি শিরোপা জিতে ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়লো। শনিবার ফাইনালে প্রথম ইনিংসের লিডে ৮ বারের চ্যাম্পিয়ন কর্ণাটককে হারিয়ে এই ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়লো জম্মু ও কাশ্মীর।
কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের এই ঐতিহাসিক জয়ে যার বিরাট অবদান ছিল তিনি হলেন তাদের ফাস্ট বোলার আকিব নবী। শুধু ফাইনালেই নয়, যিনি সারা রঞ্জি মরশুম জুড়েই অসাধারণ বোলিং করে ১৭ ইনিংসে ৬০টি উইকেট,গড় ১২.৬৩ নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়েছেন। সেই সঙ্গে টুর্নামেন্টের ৯২ বছরের ইতিহাসে তিনি মাত্র তৃতীয় পেসার হিসেবে এক মৌসুমে ৬০ উইকেট শিকার করেছেন। আর তার এই পারফরম্যান্সই প্রতিপক্ষ দলের জন্য কতটা বিপজ্জনক ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফাইনালে কর্ণাটকের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ৫টি উইকেট নিয়ে এই মরসুমে তিনি সপ্তমবারের মতো এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়েছেন। এই অসাধারণ কৃতিত্ব বলের উপর তার আধিপত্য প্রমাণ করে। তার দুর্দান্ত স্পেলের ফলে, কর্ণাটক প্রথম ইনিংসে ২৯৩ রানে অল আউট হয়ে যায়।
এ সাফল্য কিন্তু হঠাৎ করে পাওয়া নয়,গত মরশুমেও রনজি ট্রফিতে আকিব নবী ১৮ ম্যাচে মোট ৯৭ উইকেট শিকার করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
আকিব নবী জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে ৩৯টি প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচ, ৩৬ লিস্ট এ এবং ৩৪ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। এই ম্যাচগুলিতে তিনি যথাক্রমে ১৪২, ৫৬ এবং ৪৩ উইকেট শিকার করে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। ব্যাট হাতেও ছিল তার নজরকাড়া পারফরম্যান্স। তিনটে ফরম্যাটেই যথাক্রমে ৯২৫, ৫৭২ এবং ১৪১ রান করেছেন।
এই আকিব নবীর নামটা এখন ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাপক ভাবে আলোচনার মধ্যে চলে এসেছে। জম্মু-কাশ্মীরের ২৯ বছর বয়সি এই পেস বোলার বর্তমানে যে ভাবে আগুন ফর্মে রয়েছেন তাতে টিম ইন্ডিয়ায় ঢোকার জন্য এটাই যথেষ্ট। আর তিনিও একেবারে তৈরি। টিম ইন্ডিয়া নির্বাচকদের নজরও এখন তার ওপর পড়েছে।
আকিব নবী
গত এক দশক ধরে, জম্মু ও কাশ্মীর প্রচুর প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরি করে আসছে। ভারতের প্রাক্তন অলরাউন্ডার ইরফান পাঠান ঘরোয়া দলের সাথে থাকার সময় এই রাজ্যের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। যদিও পারভেজ রসুল ভারতের হয়ে খেলার জন্য একমাত্র জম্মু ও কাশ্মীর খেলোয়াড় ছিলেন, তবুও প্রতিভা বিকাশ অব্যাহত রেখেছে, ফাস্ট বোলার উমরান মালিক তার প্রথম আইপিএল মরশুমে ১৫৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার বেশি গতিতে বল করার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেছেন। মালিক কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন, যদিও ভারতের ক্রিকেট জগত আশা করছে যে তিনি শীঘ্রই ফিরে আসবেন।
এরপর, জম্মু ও কাশ্মীরে আরেক তারকা আকিব নবীর জন্ম হচ্ছে। ২৯ বছর বয়সী এই ফাস্ট বোলার এবারই সফল নন, গত কয়েক বছর ধরেই ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ আলোড়ন তুলেছেন।
২০২৪-২৫ মৌসুমে, জম্মু ও কাশ্মীর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল, সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল কারণ তারা একটি কঠিন গ্রুপে ছিল। নবী তাদের হয়ে ৪৪ উইকেট নিয়ে অসাধারণ পারফর্ম করেছিলেন, যার মধ্যে একটি হ্যাটট্রিকও ছিল। গত মৌসুমে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীও ছিলেন এবং অন্য যেকোনো ফাস্ট বোলারের চেয়ে বেশি উইকেট পেয়েছিলেন। উইকেটগুলি ১৩ গড়ে এবং ৩০.৪৭ স্ট্রাইক রেট নিয়ে এসেছিল, যা এটিকে আরও অবিশ্বাস্য করে তুলেছিল।
নবীর গতি অত্যন্ত তীব্র, তিনি ধারাবাহিকভাবে ১৪০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে বল করেন এবং বল সুইং করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তার। প্রকৃত গতি এবং সুইংয়ের মারাত্মক সংমিশ্রণে কোয়াটার ফাইনালে দিল্লির অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের ধ্বংস করে দিয়েছিল। তার এই অসাধারণ কৃতিত্ব সত্ত্বেও, নবী এখনও ইন্ডিয়া এ-তে ডাক পাননি, যা অনেক আগেই কাঙ্ক্ষিত ছিল।
খেলার মাঠে আকিব নবী
তবে, গত বছর দলীপ ট্রফির জন্য নর্থ জোন দলে ডাক পেয়েছিলেন নবী এবং সেখানেও তিনি হ্যাটট্রিক করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই পেসার এখনও তার জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে প্রয়োজনীয় ভাগ্য পাননি। সম্ভবত, আগামী ১২ মাস এমন সময় হতে পারে যখন নবী তার নাম আরও বড় স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুযোগ পাবেন।
জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লার ফাস্ট বোলার আকিব নবী দার কঠোর পরিশ্রম, নেট বোলার হিসেবে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফর্ম করে উঠে এসেছেন।
সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা আকিবের বাবা চেয়েছিলেন তিনি ডাক্তার হন, কিন্তু ক্রিকেট ছিল তাঁর নেশা। সুতরাং ডাক্তার কেন হবেন তিনি। শুরুর দিকে তিনি নেট বোলার হিসেবে কাজ করেছেন এবং নিজের প্রথম ম্যাচ ফি দিয়ে স্পাইক জুতো কিনেছিলেন। এত সংগ্রাম করে জম্মু ও কাশ্মীরের এই সোনার ছেলে নবী এখন শুধু কাশ্মীরকেই নয় টিম ইন্ডিয়াকেও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।টিম ইন্ডিয়া থেকে কবে ডাক আসবে সেই দিকেই চেয়ে রয়েছেন নবীর সঙ্গে কাশ্মীর বাসীরাও।