আমির মহল থেকে এক পরিবর্তনের সুরকার: মানবতা ও সঙ্গীতে নবাবজাদা আসিফ আলি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
নবাবজাদা আসিফ আলি
নবাবজাদা আসিফ আলি
 
শ্রীলতা এম

ভালো রাজপুত্র বা নবাবকে কে না ভালোবাসে? রূপকথার রাজপুত্র-রাজকন্যার গল্প ভাবতে বেশ রোমাঞ্চকর, যতক্ষণ না সেই রাজপুত্ররা বাস্তব জীবনে স্বৈরাচারী দানবে পরিণত হয়, যেমনটা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু এখানে এমন এক রাজপুত্রের কথা বলা হচ্ছে, যিনি শুধু দানশীলতা ও সহমর্মিতার প্রতীক নন, তাঁর চারপাশে সর্বদা সঙ্গীত ও সুরের আবেশ ছড়িয়ে থাকে।
 
প্রিন্স অব আর্কটের কথা শুনেছেন? তিনি হলেন নবাবজাদা মহম্মদ আসিফ আলি, আর্কটের নবাবের পুত্র।আর্কট পরিবারের প্রিন্স চেন্নাইয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রভাব রাখেন। এই রাজপ্রাসাদ মানবিক কর্মকাণ্ডের এক কেন্দ্র, যার নেতৃত্ব দেয় আর্কট ফাউন্ডেশন।
 

বর্তমান প্রিন্স, নবাব মহম্মদ আব্দুল আলি, সবার কাছে স্নেহভাজন। তবে দৈনন্দিন জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড, ত্রাণ বিতরণ, আন্তঃধর্মীয় অনুষ্ঠান ও নানা উদ্যোগ; মূলত পরিচালনা করেন তাঁর পুত্র নবাবজাদা মোহাম্মদ আসিফ আলি।
 
ধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো আর্কট ফাউন্ডেশনের অসংখ্য ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ত্রাণ কর্মসূচির মধ্যেই আসিফ আলির উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদিও মানবিক কর্মকাণ্ডে তিনিই পরিবারের জনসম্মুখের মুখ, তবু সাম্প্রতিক সময়ে আমির মহলের দরজা থেকে ভেসে আসা সুরেলা সঙ্গীত তাঁকে আলাদা করে নজরে এনেছে। তাঁর নেতৃত্বে আমির মহলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও আন্তঃধর্মীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাখেন এবং তাঁদের সম্মেলনেও উপস্থিত থাকেন।
 
ছাত্র - ছাত্রীদের সঙ্গে আসিফ আলি
 
নবাবজাদা প্রকাশ করেন একটি অ্যালবাম, ‘রাস্তে’ যা তাঁর অনুরাগীদের জন্য ছিল এক মনোরম চমক। এই অ্যালবামটি প্রকাশ করেন স্বয়ং এ আর রহমান, যাঁর সঙ্গে নবাবজাদার গভীর স্নেহের সম্পর্ক রয়েছে। আসিফ আলির মতে, ‘রাস্তে’ অ্যালবামটি আর্কট পরিবারের চিরন্তন দর্শনেরই প্রতিফলন, বিভিন্ন পথের সমন্বয় এবং এই সত্য যে সব পথই শেষ পর্যন্ত এক গন্তব্যে গিয়ে মেলে। তিনি বলেন, “পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। একটি পথ আরেকটির চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এমনটা নয়।”
 
কানে আরামদায়ক ও মনকে উদ্বুদ্ধ করা এই গানটির ভিডিও ধারণ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে।গানটির সৃষ্টি প্রসঙ্গে নবাবজাদা জানান, এক সকালে পিয়ানো বাজাতে বাজাতেই সুরটি তাঁর মনে আসে। “আমি নিয়মিত সুর তৈরি করি এবং সাধারণত সেগুলো লাইব্রেরির হার্ড ডিস্কে সংরক্ষণ করি। কিন্তু এই সুরটির সঙ্গে আমার বিশেষ আবেগ জড়িয়ে পড়ে,” বলেন তিনি।
 
অ্যালার্ট বিং অ্যাওয়ার্ডস- এর অষ্টম সংস্করণে আসিফ আলি
 
তিনি লেখেন গানটির কথা, “রাস্তে, ভাবছি এই পথ আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে। গন্তব্যের ইশারা পাই… মনে হয় আকাশ ছুঁয়ে ফেলি। এই পথেই হাঁটতে হবে, গন্তব্য খুঁজে নিতে হবে আর যাত্রা শেষ করার সাহস খুঁজে নিতে হবে…”, এরপর তিনি সেরা সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেন এবং এ আর রহমানকে অনুরোধ করেন অ্যালবামটি প্রকাশ করতে। নবাবজাদা জানান, গানটি আর্কট ফাউন্ডেশনের সকল উদ্যোগের পেছনের দর্শন থেকেই অনুপ্রাণিত, ভিন্ন ভিন্ন পথ, কিন্তু গন্তব্য এক।
 
মানবিক কাজের পাশাপাশি সঙ্গীত তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বহু গান রচনা করেছেন এবং লাকি আলির সঙ্গে কাজ করেছেন, যিনি তাঁর আত্মীয়। এসপি বালাসুব্রামানিয়মের কণ্ঠে গাওয়া তাঁর সুরে একটি গান তামিল চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকার তামিলদের জন্য নির্মিত। তাঁর আরও বহু গান দক্ষিণ আফ্রিকার তামিল চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে।
 
আমির মহলে আসিফ আলির কিছু ছবি
 
ভেলোরের কাছে অবস্থিত আর্কট একটি ছোট শহর। সপ্তদশ শতকে, যখন ঔরঙ্গজেব তাঁর এক সেনানায়ককে আর্কট অঞ্চলে পাঠান, তখন এটি কর্ণাটক তথা কার্নাটিক অঞ্চলের অংশ ছিল, যা বর্তমান তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত।
 
১৬৯২ সালে ঔরঙ্গজেব মারাঠাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে জুলফিকার খানকে কার্নাটিকের প্রথম সুবেদার নিযুক্ত করেন, যার রাজধানী ছিল আর্কট। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর আর্কট একটি স্বতন্ত্র সুলতানাতে পরিণত হয়। যদিও ১৭৪০ সালে মারাঠাদের হাতে নবাবরা পরাজিত হন, পরে ব্রিটিশদের সমর্থনে আবার শাসন ফিরে পান। কিন্তু ‘ডকট্রিন অব ল্যাপস’-এর ফলে তাঁরা সব হারান, যদিও ব্রিটিশ রানি তাঁদের উপাধি ও ভাতা বজায় রাখার আশ্বাস দেন।
 
প্রিন্স অব আর্কটের আতিথেয়তায় অস্ট্রিয়ান ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল
 
ইতিহাসের এই বিবর্ণ পৃষ্ঠাগুলি আজ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্বাধীন ভারতের প্রেক্ষাপটে আর্কটের নবাবরা যে সম্মান অর্জন করেছেন, তার মূল কারণ তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ ও সংযত অবস্থান। এই কারণেই আজ আসিফ আলি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ নীরব, কিন্তু গভীর প্রভাব ফেলে, মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে, সংলাপের পথ খোলা রাখে এবং ক্ষমতার বদলে দয়ার ওপর ভিত্তি করে এক জনসম্মুখের উপস্থিতি তৈরি করে।
 
বিভাজন যখন সহজেই উসকে দেওয়া যায়, তখন এই ধীর কিন্তু দৃঢ় ঐক্যের সেলাইই তাঁকে প্রকৃত পরিবর্তনকারীতে পরিণত করে। আজ আমির মহল থেকে ভেসে আসা সুর, সমন্বয় ও অগ্রগতির, রাজকীয়তাকে রূপ দিচ্ছে আরও মহৎ কিছুতে।