আওয়াজ- দ্য ভয়েস-এর বিশেষ পডকাস্ট 'দীন অর দুনিয়া'-তে সাকিব সেলিমের সঙ্গে অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসে
মনসুরুদ্দিন ফরিদী / নয়া দিল্লি
আজকের যুগে, যেখানে প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় এবং যোগাযোগের ধরন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, সেই পরিবর্তন কি আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াকেও উন্নত করছে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়েই অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসে ‘আওয়াজ – দ্য ভয়েস’-এর বিশেষ পডকাস্ট ‘দীন এবং দুনিয়া’–র আলোচনায় মত প্রকাশ করেন। সঞ্চালক সাকিব সেলিমের সঙ্গে তাঁর এই কথোপকথন শুধুই একটি সাক্ষাৎকার ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক সমাজ, ধর্মের ভাষ্য ও সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তবতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।
আলোচনার শুরুতেই ওঠে আসে ‘কাফির’ শব্দের প্রসঙ্গ। অধ্যাপক ওয়াসে অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে বলেন, মানুষ আজ শব্দের গভীরতা ভুলে গেছে। ‘কাফির’ শব্দটি এখন ঘৃণা ও বৈরিতা বাড়ানোর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অথচ আক্ষরিক দৃষ্টিতে দেখলে, শব্দটির ব্যবহার যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই হতে পারে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি এখন দায়িত্বহীনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই সংবেদনশীলতার অভাবই সমাজে অবিশ্বাসের দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের স্পর্শকাতর শব্দ নিয়ে খেলাধুলা বন্ধ করতে হবে।
ধর্ম নিয়ে আলোচনা ভুল নয়, কিন্তু সমস্যার শুরু তখনই, যখন প্রত্যেকেই নিজেকে বিশেষজ্ঞ ভাবতে শুরু করে। অধ্যাপক ওয়াসে স্পষ্টভাবে বলেন, ধর্মের ব্যাখ্যা করার অধিকার শুধুমাত্র তাঁদেরই থাকা উচিত, যারা বছরের পর বছর ধর্মগ্রন্থ- কুরআন, হাদিস, তাফসির ও ইসলামি আইনশাস্ত্র, গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া মন্তব্য করা সমাজকে বিভ্রান্ত করার সমান। আজ ইন্টারনেট সুবিধার কারণে সবাই নিজেকে ‘পণ্ডিত’ ভাবতে চাইছে, এ প্রবণতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনই ধর্মের মূল ধারণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নিজেকে আলাদা প্রমাণ করার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অধ্যাপক ওয়াসে কটাক্ষ করে বলেন, কয়েকজন এমন আছেন যারা ধর্মকে অপপ্রচারের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। এর ফলে ইসলামের সম্পর্কে বহু ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে, আর মুসলমানদের মধ্যেও আচরণগত দুটি ভিন্ন ধারা তৈরি হয়েছে, একদল নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবছে, অন্যদিকে কেউ কেউ হীনমন্যতার শিকার হচ্ছে। তিনি মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করে বলেন, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার অনেক সময়ই অন্তর্নিহিত হীনমন্যতার বহিঃপ্রকাশ। এই মানসিক টানাপোড়েনই সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
আলোচনায় আধুনিকতা ও গণতন্ত্রের প্রসঙ্গও উঠে আসে। আজও কিছু মানুষ আছেন যারা প্রতিটি আধুনিক জিনিসকে ইসলামবিরোধী বা ‘তাগুতী’ বলে আখ্যা দেন। অধ্যাপক ওয়াসে এর উত্তরে ইতিহাসের উদাহরণ টেনে আনেন, তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের সময়কার কথা উল্লেখ করেন, যখন আধুনিক শিক্ষার তীব্র বিরোধিতা হয়েছিল। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, শিক্ষা ও উন্নতি ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। তিনি বলেন, আমাদের ‘আকিদা’ অর্থাৎ বিশ্বাস এবং ‘আকিদাত’ অর্থাৎ ভক্তির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। কারও ফতোয়া দিলেই কোনো বিষয় ইসলামবিরোধী হয়ে পড়ে না। আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসে
সহনশীলতা ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের প্রসঙ্গেও অধ্যাপক ওয়াসে হৃদয়গ্রাহী কথা বলেন। ভারতের মতো দেশে, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে, সেখানে একে অপরকে সম্মান দেওয়াই সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিশ্বের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে এসেছিলেন, বিভাজন তৈরি করতে নয়। মক্কার প্রতিকূল সময় হোক বা মদিনার সফল অধ্যায়, তিনি সর্বত্রই ভালোবাসা, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিয়েছেন। তাঁর ‘শেষ উপদেশ’–এও মানুষের ঐক্য ও ন্যায়পরায়ণতার কথাই বলা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িকতা যতই চোখে পড়ুক, অধ্যাপক ওয়াসে মনে করেন বাস্তবে ধর্মান্ধতা কমেছে, মানুষ ধীরে ধীরে উদারতা ও ভারসাম্যের পথে ফিরছে।
চারটি বিয়ে নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের প্রসঙ্গেও তিনি খোলামেলা মত দেন। তিনি এটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এটি প্রায়ই উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইসলাম চার বিবাহের অনুমতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটিকে কখনোই বাধ্যতামূলক করা হয়নি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো- ‘ইনসাফ’ অর্থাৎ পূর্ণ ন্যায়বিচার। কুরআন নিজেই বলছে, একাধিক স্ত্রীর প্রতি সমান ন্যায়বিচার করা মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। বাস্তবেও দেখা যায়, আজকের যুগে পুরুষেরা চতুর্থ বিয়ে করার পথে হাঁটছে না এবং নারীরাও নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে না। তাহলে অযথাই এই বিষয়টিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রে পরিণত করা উচিত নয়। সিদ্ধান্ত সবসময় প্রয়োজন, পরিস্থিতি ও ন্যায়বোধের ওপর নির্ভরশীল, এটি কোনো সম্প্রদায়ের পরিচয় হতে পারে না।
আওয়াজ- দ্য ভয়েস-এর বিশেষ পডকাস্ট 'দীন অর দুনিয়া'-তে সাকিব সেলিমের সঙ্গে অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসে
আলোচনার শেষে অধ্যাপক ওয়াসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন, আমাদের আচরণে সরলতা, নম্রতা ও সত্যতা বজায় রাখতে হবে। হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বা তাঁর সাহাবিদের পথের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রদর্শনীমূলক আচরণ থেকে দূরে থাকতে হবে। ধর্মের প্রতিনিধিত্ব হতে হবে প্রাঞ্জল, বাস্তবসম্মত ও কল্যাণকর। তাঁর বার্তা একটাই, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক সম্মান অটুট থাকা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসের এই কথাগুলো সত্যিই এক শীতল বাতাসের মতো। সোশ্যাল মিডিয়ার কোলাহলে যারা নিজেদের ঐতিহ্য, আচরণ ও সংস্কৃতির মূল চেতনাকে ভুলে যাচ্ছে, এই পডকাস্ট তাঁদের জন্য বিশেষভাবে পথনির্দেশক।