আওয়াজ দ্য ভয়েস
নারীরা যখন রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন, তখন তারা শুধু ক্ষমতার কোনও পদ পূরণ করেন না, তারা নতুন সংজ্ঞা দেন সাহস, সেবা ও নেতৃত্বকে। দলীয় বিভাজন, মতাদর্শ কিংবা ভৌগোলিক পার্থক্য, এসব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকেও এসব নারী বহুদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, প্রতিরোধ পেরিয়ে এগিয়েছেন, আর দৃঢ় বিশ্বাস ও মমত্ববোধের সংমিশ্রণে নিজেদের জন্য তৈরি করেছেন প্রভাবের ক্ষেত্র।
'আওয়াজ দ্য ভয়েস '-এর উদ্যোগে পারওয়াজের এই কার্টেন রেইজার তুলে ধরে এমন নারীদের কাহিনি, যাদের পথচলা ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য এক: অনুপ্রেরণা জাগানো।
দারাখশান আন্দ্রাবি
কাশ্মীরের মাটির এক নির্ভীক কণ্ঠ দারাখশান আন্দ্রাবি, যিনি রাজনৈতিক দৃঢ়তার এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি। ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় নির্বাহী সদস্য এবং জম্মু–কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের একমাত্র মহিলা চেয়ারপার্সন হিসেবে তিনি মার্চ ২০২২-এ দায়িত্ব নেন, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের পর প্রথমবার এই পদে কেউ বসেন। তিন দশক ধরে তিনি একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে ডিজিটাইজেশন ও সংস্কারের মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডকে স্বচ্ছতর করেছেন। তার কাজের পরিধি প্রশাসনের বাইরে; সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসবাহী অঞ্চলে শান্তি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক কল্যাণে তার নিরন্তর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে নজরকাড়া। কবি, শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন সম্পাদক হিসেবে কাশ্মীরি ও উর্দু সাহিত্যে তার অবদান তার জনজীবনকে আরও বহুমুখী করেছে।
ড. সামিনা বেগম
ড. সামিনা বেগম নেতৃত্ব দেন শব্দের বাড়াবাড়ি নয়, নীরব কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে। অল ইন্ডিয়া মিম-এর সিনিয়র নেতা এবং হায়দ্রাবাদের কুরমাগুড়া ডিভিশনের কর্পোরেটর হিসেবে তিনি তৃণমূল শাসনের সঙ্গে যুক্ত, পাশাপাশি চিকিৎসক ও উদ্যোক্তা হিসেবে তার পরিচিতি বিস্তৃত। সামিনা গ্রুপ অফ হসপিটালস প্রতিষ্ঠা করে তিনি একটি ছোট মাতৃসদনকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বস্ত বহুবিভাগের হাসপাতালে। একইসঙ্গে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণেও বিনিয়োগ করেছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার সামনের সারির ভূমিকা, নাগরিকদের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযোগ, এবং নারী উন্নয়নে নিরলস মনোযোগ তাকে দিয়েছে জনগণের গভীর আস্থা, প্রমাণ করেছে, নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি সরাসরি মানুষের জীবনে উন্নতির রূপ নিতে পারে।
ইকরা হাসান
ইকরা হাসান এমন এক তরুণ নেতৃত্ব, যেখানে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য মিলেছে সুচিন্তিত প্রস্তুতি ও আধুনিক কালের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৈরানা থেকে চারবারের সাংসদ মুনাওয়ার হাসানের পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতির বাস্তবতা ও জনজবাবদিহিতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কিন্তু তার নিজের রাজনৈতিক পথচলা শুধু উত্তরাধিকার নয়, ভারত ও বিদেশে আইনের ওপর প্রশিক্ষণ তাকে দিয়েছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকারের গভীর ভিত্তি। কৃষি সংকট, বেকারত্ব এবং পরিচয়নির্ভর উত্তেজনার অঞ্চলে নিজের বয়স ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ওঠা সংশয় তিনি মেটাচ্ছেন তৃণমূলের সঙ্গে দিনরাত কাজ করে, শব্দযুদ্ধ নয়। তরুণ মুসলিম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি নীরবে চ্যালেঞ্জ করছেন বহু প্রচলিত ধারণাকে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষকের অধিকার ও গণতান্ত্রিক মৌলিকতার মতো প্রশ্নগুলো সামনে এনে। তার যাত্রা মনে করিয়ে দেয়: নেতৃত্ব জন্মসূত্রে নয়, সহমর্মিতা, প্রস্তুতি ও উদ্দেশ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
কৌসর জাহান
ব্যক্তিগত শোকের ভেতর থেকে জনসেবার পথ বেছে নেওয়ার গল্প কৌসর জাহানকে আলাদা করে তোলে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি হজ কমিটির দ্বিতীয় মহিলা চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। মহামারিতে বাবা–মাকে হারানোর পর, বিদেশে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশে থেকে উদ্যোক্তা, সমাজসেবক ও ‘সম্পূর্ণা’ উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নে নিজেকে যুক্ত রাখেন। বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত কাউসার জাহান তার অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, উষ্ণ মানবিকতা এবং দৃঢ় জাতীয় চেতনায় নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।
মেহবুবা মুফতি
জম্মু–কাশ্মীরের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসে মেহবুবা মুফতি এক পথিকৃৎ। মিলিটেন্সির তুঙ্গে, যখন মূলধারার রাজনীতি বিপন্ন, ঠিক তখনই তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন-১৯৯৬ সালে। পরবর্তীতে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জোট সরকার গঠন থেকে শুরু করে সংসদীয় ভূমিকা, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের পর গ্রেফতারি ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়েও তিনি আজও কাশ্মীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
মুমতাজ তাহা
ত্রিশূর পৌর কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম মহিলা কাউন্সিলর হিসেবে মুমতাজ তাহা সত্যিই এক নতুন ইতিহাস রচনা করেন, হিন্দুপ্রধান কান্নানকুলাঙ্গারা ওয়ার্ডে বিজেপির প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়ে। নিজের এলাকায় দীর্ঘদিনের নিবিড় কাজের ফলে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত ‘ওয়ার্ডের কন্যা’ হিসেবে-ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে। জে জয়ললিতার অনুপ্রেরণায় তিনি এখন মন দিচ্ছেন স্থানীয় শাসন, নারীর শিক্ষা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে, এ যেন অধ্যবসায় ও আন্তসম্প্রদায়িক বন্ধনের ভিত্তিতে গঠিত এক বাস্তববাদী নেতৃত্ব।
সায়রা শাহ হালিম
সায়রা শাহ হালিম স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকারের সংযোগস্থলে কাজ করা এক উল্লেখযোগ্য সমাজকর্মী ও জনবুদ্ধিজীবী। দীর্ঘ কর্পোরেট জীবনের পর তিনি ‘কলকাতা হেলথ সংকল্প’-এর মতো উদ্যোগ গড়ে তোলেন, যা কম খরচে ডায়ালাইসিস সুবিধা পৌঁছে দেয় সুবিধাবঞ্চিতদের কাছে। একইসঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে তিনি নানা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। ২০২২ সালে সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি কলকাতায় বাম রাজনীতিতে নতুন জাগরণে ভূমিকা রাখেন। তার ২০২৪ সালের বই Comrades and Comebacks সামাজিক ন্যায়, বহুত্ববাদ ও মানুষকেন্দ্রিক রাজনীতির যে দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বহন করেন, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
শামা মহম্মদ
শামা মহম্মদের রাজনৈতিক যাত্রা তৈরি হয়েছে পিতৃতন্ত্র, ধর্মীয় পক্ষপাত এবং বংশগত সুবিধাহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে। একসময় দন্তচিকিৎসক ও সাংবাদিক ছিলেন তিনি, কিন্তু দ্বিতীয় সারি থেকে মন্তব্য নয়, বরং ভেতর থেকে পরিবর্তনের অংশ হওয়ার সিদ্ধান্তই তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মুখপাত্র এবং কেরালার তৃণমূল কর্মী হিসেবে তিনি ধারাবাহিকভাবে সামনে এনেছেন নারী প্রতিনিধিত্ব ও সংখ্যালঘু অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। জোয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও নারী কল্যাণে তার কাজ দেখিয়ে দেয়, রাজনীতি দলের বাইরেও জনসেবার এক বিস্তৃত পরিসর তৈরি করতে পারে।
সোফিয়া ফিরদৌস
২০২৪ সালের ওড়িশা বিধানসভা নির্বাচনে হঠাৎ করেই রাজনীতিতে প্রবেশ করে সোফিয়া ফিরদাউস ভারতের অল্পসংখ্যক মুসলিম মহিলা বিধায়কদের একজন হয়ে ওঠেন। মুসলিম জনসংখ্যা কম এমন বরাবাটি–কটক কেন্দ্রে খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে তার জয় ছিল উল্লেখযোগ্য। রিয়েল এস্টেট জগত থেকে রাজনীতির ময়দানে এসে তিনি মন দিয়েছেন কটকের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে, বিশেষ করে বিখ্যাত রুপোর ফিলিগ্রি শিল্পকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান- বিশেষত নারীদের জন্য- তার প্রাধান্য। তার বিজয় প্রমাণ করেছে আন্তসম্প্রদায়িক আস্থা রাজনীতিকে কতটা শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
জাহিদা খান
মেওয়াট অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রথম সারির অগ্রদূত জাহিদা খান, আর রাজস্থানের এই অঞ্চল থেকে তিনিই প্রথম মহিলা বিধায়ক। সফল আইনজীবী থেকে জনজীবনে এসে তিনি তিন প্রজন্ম ধরে চলা শিক্ষা ও সংখ্যালঘু অধিকারভিত্তিক সমাজসংস্কারের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়েছেন। দু’বারের বিধায়ক এবং রাজস্থানের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীর শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং সাংস্কৃতিক অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার পথচলা নারীশক্তির অনুপ্রেরণা তো বটেই, সমগ্র সমাজের জন্য মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা।
এই সব নারীর সম্মিলিত পথচলাই পরওয়াজের অন্তরাত্মা, প্রমাণ করে যে সাহস ও বিবেক যখন রাজনীতিকে চালিত করে, তখন তা হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তন ও অনুপ্রেরণার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।