শ্রীলতা এম / কোয়েম্বাটুর
নাচ তার কাছে ছিল না কোনও শখ বা বিনোদন, ছিল আত্মপ্রকাশের এক স্বাভাবিক ভাষা। শৈশবেই, অজান্তেই, সেই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিল এক ছোট ছেলে, যা দেখে তার বাবা–মা বিস্মিত ও শঙ্কিত হয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই নীরব নাচই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। কিন্তু সালেমের এক রক্ষণশীল উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা জাকির হুসেনের জন্য নৃত্যের পথ বেছে নেওয়া ছিল সাহসিকতার পরীক্ষা।
সমস্ত বাধা ও সংশয় অতিক্রম করে আজ ৫৫ বছর বয়সী জাকির হুসেন একজন সুপরিচিত ভরতনাট্যম শিল্পী এবং তামিলনাড়ু রাজ্য শিল্প ও সংস্কৃতি দপ্তরের সম্মানীয় পরিচালক।
নৃত্য পরিবেশনের মুহূর্তে জাকির হুসেন
শৈশবের কথা স্মরণ করে হুসেন বলেন, তাঁর পরিবার তেলেঙ্গানা থেকে তামিলনাড়ুতে এসে বসবাস শুরু করে। “বাড়িতে আমরা উর্দু বলতাম, বাইরে তামিল। আমার নাচের প্রতি আগ্রহ বাবার কখনওই পছন্দ ছিল না,” বলেন তিনি। সময়ের প্রচলিত ধারা মেনে তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি অর্জন করেন, কিন্তু তারপরও এক ধরনের অস্থিরতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন “আমি ভাবতে শুরু করলাম, নাচকেই পেশা হিসেবে নেব।” ফলে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও প্রাতিষ্ঠানিক নাচের প্রশিক্ষণ না থাকলেও তিনি সালেম ছেড়ে চেন্নাইয়ে পাড়ি জমান একজন নৃত্যগুরুর সন্ধানে।
তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী চিত্রা বিশ্বেশ্বরনের কাছে সুযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে খরচ চালানোর উদ্দেশ্যে তিনি একটি হোটেলে কাজও করেন। “অবশেষে আমি তাঁর কাছে সুযোগ পাই এবং তাঁর ক্লাসে যোগ দিই। চিত্রা ম্যাডাম আমাকে বিনামূল্যে শেখাতেন, এমনকি মাসে ২৫০ টাকা স্টাইপেন্ডও দিতেন,” স্মৃতিচারণ করেন হুসেন।
পরিবারের আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি তখন একাই থাকতাম, তাই পরিবারের আপত্তি নিয়ে ভাবিনি। আমি বিয়েও করিনি। জীবনের তরুণ সময়ের বড় অংশ বিদেশে কাটিয়েছি।” প্রায় ১৪ বছর তিনি কানাডা, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে ছিলেন, সেখানে প্রবাসী ভারতীয়দের নাচ শেখাতেন। বছরে একবার মাত্র ডিসেম্বর মাসে দেশে আসতেন, কারণ তখন বিদেশে কাজ কম থাকত। “বিদেশে পারফর্ম করে আমি পরিচিতি পেয়েছি,” বলেন তিনি।
পুরুষ মুসলিম শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন তিনি তেমন সমস্যার মুখে পড়েননি বলে জানান হুসেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন তিনি নাচ ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। “আমার যাত্রা এখন রাজনীতির দিকে,” বলেন হুসেন, যিনি ডিএমকে-তে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাঁর মতে, নৃত্য ও সঙ্গীতের জগতে যেমন অবনতি ঘটেছে, তেমনই দেশের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশও নিম্নমুখী। শাস্ত্রীয় নৃত্যের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “৮০ ও ৯০-এর দশকে, এমনকি ২০০০ সাল পর্যন্তও প্রচুর অনুষ্ঠান হতো এবং নাচে ভালো রোজগার ছিল। এখন আর তেমন নেই।”
“এখন অনুষ্ঠানে লোক ডেকে আনতে হয়। সাধারণ দর্শক আগ্রহী নয়। মূলত নৃত্যশিল্পী বা নৃত্যশিল্পীদের অভিভাবকরাই একে অপরকে সমর্থন করতে আসেন। করোনা-পরবর্তী সময়ে অবস্থা আরও করুণ। এখন ২০–২৩ জন দর্শক পেলেই বড় কথা। ২০০ জন এলে তাকে ‘বিরাট’ বলা হয়। আগে ৮০০–৯০০ জন দর্শক আসত। জেন-জি অতীতের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে, তাদের আগ্রহ অন্যদিকে। সবাই টাকা রোজগারের দৌড়ে ব্যস্ত। এই দৌড়ের মাঝে নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পীরা মাঝপথে পড়ে গেছেন।”
হুসেনের মতে, চাহিদা না থাকায় শাস্ত্রীয় নৃত্য ও সঙ্গীত আজ বিপন্ন। তিনি বলেন, যুবসমাজ এর সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাচ্ছে না, তাই শাস্ত্রীয় নৃত্য সমাজের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “২৩ বছরের একজন যুবক আইটি সেক্টরে কাজ করে মাসে কয়েক লক্ষ টাকা উপার্জন করতে পারে। একজন নৃত্যশিল্পী কি তা পারে? তাহলে কেউ নাচ শিখবে কেন? কেবলমাত্র শীর্ষস্থানীয় শিল্পীরাই ভালো পারিশ্রমিক পান।”
নৃত্য পরিবেশনের কিছু মুহূর্তে জাকির হুসেন
শুধু চাহিদা কমাই নয়, সময়ের চাপে শিল্পরূপের বিকৃতিও নৃত্য ও সঙ্গীতকে আঘাত করছে বলে তিনি মনে করেন। আগে দুই ঘণ্টার অনুষ্ঠান হতো, এখন কেরালার মতো রাজ্যে তা ২০ মিনিটে সীমাবদ্ধ। “কেরালার নৃত্যোৎসবে দর্শকরা ২০ মিনিটের বেশি নাচ দেখতে চান না। ক্রিকেট ম্যাচও এখন পাঁচ ঘণ্টা আর ২০ ওভারে নেমে এসেছে। মানুষ তাড়াহুড়োয় আছে, নাচ বা সঙ্গীতের জন্য সময় বা টাকা দিতে চায় না,” বলেন তিনি।
কৃষ্ণভক্ত আন্দালের কাহিনি নিয়ে করা তাঁর নৃত্যরচনার জন্য হুসেন বিশেষভাবে পরিচিত। কিংবদন্তি অনুযায়ী, আন্দাল শ্রীরঙ্গমের রঙ্গনাথস্বামী মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। “অনেকে আন্দালের কাহিনি নিয়ে নাচ করেছেন। কিন্তু আমার কাছে নাচ ছিল আত্মার যাত্রা, আর আন্দালের গল্প আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে,” বলেন হুসেন, যিনি সময়ে সময়ে রঙ্গনাথস্বামী মন্দিরে অনুদান দিয়ে থাকেন।
সম্প্রতি কিছু গোষ্ঠী তাঁকে মন্দিরে অনুদান দিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা সংবাদে আসে। হুসেন বলেন, “এখন আমার নামটাই সমস্যা। ঈশ্বর আমাকে এই নাম দিয়েছেন, আমি তো নিজে বেছে নিইনি।” তিনি বলেন, “২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত ভারতে কোথাও পারফর্ম করতে আমার সমস্যা হয়নি। এখন আমার নাচের চেয়ে আমার নামটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
ক্ষোভের সঙ্গে তিনি যোগ করেন, “নৃত্যশিল্পী হিসেবে, ভক্ত হিসেবে মন্দিরে অনুদান দিতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছি। মুসলিমরা যদি ঝামেলা করে, তখন দোষ দেওয়া হয়। আর যদি কেউ শান্তির বার্তা দেয়, তখন তাকে চাওয়া হয় না।”
নৃত্য পরিবেশনের মুহূর্তে জাকির হুসেন
“যে স্বীকৃতি আমি অন্যত্র পাইনি, তা আমি ডিএমকে-তে পেয়েছি, কারণ তারা সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়,” বলেন তিনি। “এই কারণেই আমি ডিএমকে এবং রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন আমি ডিএমকের অংশ হিসেবে নিরাপদ বোধ করি। তারা সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে। তারা কখনও বলেনি যে মুসলিমরা মন্দিরে পারফর্ম করতে বা দান করতে পারবে না। আমি গতকালই রঙ্গনাথস্বামী মন্দিরে গিয়েছি। এখন আর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না,” গর্বের সঙ্গে বলেন তিনি।
বর্তমানে হুসেন তামিলনাড়ু রাজ্য শিল্প ও সংস্কৃতি দপ্তরের সম্মানীয় পরিচালক, যার অধীনে রাজ্যের নাচ ও সঙ্গীত বিদ্যালয়গুলি পরিচালিত হয়। নিজের নৃত্যশিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করা হুসেন বলেন, তাঁর কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। “আমি পরিকল্পনায় বিশ্বাস করি না। যা আসে, স্রোতের সঙ্গে ভেসে তা গ্রহণ করি।”
তিনি স্পষ্ট করেন, কাউকে জোর করে নাচ বা সঙ্গীত শেখাতে চান না। “জোর করা যায় না। আমার একটাই ইচ্ছা, প্রতিটি শিল্পী যেন শেখার ও পারফর্ম করার সুযোগ পায়। শিল্পকে বেছে নেবে কি না, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, ডিএমকের ছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত মনে করেন এবং তাঁর বিশ্বাস, ২০১৪ সালের পর দেশ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে সরে গিয়ে গোষ্ঠীবাদে নেমে যাচ্ছে, যেখানে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে ভয় করছে, লড়াই করছে এবং একে অপরকে আঘাত করছে।